আল জাজিরার বিশ্লেষণ
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘নেতৃত্বকে তাদের কাজের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা উচিত। তার ভাষ্য, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল একটি পরীক্ষা এবং এনসিপি এখন বাংলাদেশের ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।’
শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১১:৩৮:১২ পিএম
শেয়ার করুন:

নবোদয় ডেস্ক
চব্বিশের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ছাত্ররা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হয়। দলটির নেতারা ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে ভবিষ্যতে সরকার গঠনের ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন।
তবে অল্প সময়ের মধ্যেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভ্যুত্থানের সময় পাওয়া জনসমর্থনকে ব্যালটে রুপান্তর করতে পারেনি এনসিপি। সংসদ নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো শক্তিশালী তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলতে পারেনি তারা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে দলটির সমর্থন এক অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
পরবর্তীতে এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেয়। ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৩০টিতে এবং জয় পায় মাত্র ছয়টিতে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ব্যবধানে ২১২টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। জামায়াত-এনসিপিু নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৭৭টি আসন।
গণঅভ্যুত্থান থেকে সংসদ
অভ্যুত্থানের আলোচিত কয়েকজন নেতা এখন এনসিপির হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সমর্থকদের কাছে ছয়টি আসন একটি নবগঠিত রাজনৈতিক দলের জন্য অপ্রত্যাশিত অগ্রগতি। তবে সমালোচকদের মতে, এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, প্রতিবাদ আন্দোলন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এখনো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তবে নির্বাচনের ফলাফলকে উৎসাহব্যঞ্জক হিসেবে অভিহিত করেছেন এনসিপির মুখপাত্র ও দলের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘মাত্র ১১ মাসের একটি দলের জন্য এটি খুবই ভালো ফলাফল। অবশ্যই আরও ভালো হতে পারত। তবু আমরা খুশি।’
শুরুতে এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। পরে কৌশলগত কারণে আপস করতে হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কাঠামো বিবেচনায় প্রতিনিধিত্ব ও টিকে থাকা নিশ্চিত করতে আমাদের জোটে যেতে হয়েছে।’ জামায়াতের সঙ্গে জোট এখন এনসিপির নির্বাচন-পরবর্তী ভবিষ্যত নির্ধারণের ‘ঘুঁটি’ ও সবচেয়ে বড় টানাপোড়েনের বিষয় হয়ে উঠেছে।
জোট রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি
ধর্মভিত্তিক দল জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে শরিয়াভিত্তিক আইন ও নারীর অধিকার প্রশ্নে সবসময় রক্ষণশীল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দলটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান মেনে চলার অঙ্গীকার করেছে। এবারের নির্বাচনে দলটি নারী প্রার্থী না দিলেও প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থীও দিয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত এনসিপির ভেতরে বিভক্তির সৃষ্টি করে। জোট ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যেই এক ডজনের বেশি নেতা পদত্যাগ করেন। তাদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট এনসিপির আদর্শ ও অভ্যুত্থানের অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে দলের গ্রহণযোগ্যতা ও মধ্যপন্থী সমর্থন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
তবে এসব আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমরা ছায়া রাজনীতি করছি না। আমাদের বক্তব্য পর্যবেক্ষণ করলে দেখবেন, তা জামায়াতের বক্তব্যের মতো নয়। জামায়াতের সঙ্গে এই সমঝোতা একটি নির্বাচনী জোট, ‘রাজনৈতিক একীভূতকরণ নয়’ বলেও জোর দেন তিনি।
এনসিপি জানিয়েছে, তারা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে দলীয় নেতৃত্বে জামায়াতের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরেকটি সমঝোতার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেনি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বান্দরবান আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হওয়া এনসিপি নেতা এস এম সুজা উদ্দিন আল জাজিরাকে বলেন, সে সময় তাদের ‘বিকল্প সীমিত’ ছিল এবং জামায়াতের সঙ্গে জোটকে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
তার দাবি, এনসিপি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে বিদ্যমান নেতৃত্ব সংকটের বিরুদ্ধে একটি ‘প্রজন্মগত সংশোধন’। তিনি বলেন, “বিভিন্ন দলের তরুণ রাজনীতিকরা হতাশ। মানুষ পরিবর্তন চায়। আমরা যেখানে গেছি, সেখানেই সেই আকাঙ্ক্ষা দেখেছি।”
গত বছর জামায়াতের সঙ্গে জোট ঘোষণার আগেই পদত্যাগ করা সাবেক এনসিপি নেতা অনিক রায় মনে করেন, ‘এ মুহূর্তে এনসিপির পক্ষে জামায়াত ছাড়ার কোনো বাস্তবসম্মত পথ দেখি না।’ অনিক আরও বলেন, ‘আসল পরীক্ষা হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। যদি তারা আবার জামায়াতের সঙ্গে যায়, সেটাই তাদের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করবে।’
অনিকের মতে, জামায়াতের সমর্থন ছাড়া এনসিপি সম্ভবত কোনো আসনই পেত না। তিনি বলেন, ‘তাদের ভিত্তি নাজুক। এনসিপি জামায়াতকে শক্তিশালী করার একটি পরোক্ষ হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’
তবে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, “অনেকে মনে করেন তৃণমূল সংগঠনে প্রথমে বিএনপি, তারপর জামায়াত, এরপর এনসিপি। কিন্তু বাস্তবতা জেলা ভেদে ভিন্ন।’ কিছু আসনে স্থানীয় ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে এনসিপি প্রার্থীরা প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তৃতীয় শক্তি কি শেকড় গাঁড়তে পারবে?
এনসিপির রাজনৈতিক মূলধনের বড় অংশই ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান থেকে এসেছে, যা সাময়িকভাবে বিভিন্ন বিরোধী শক্তিকে একত্র করেছিল। সে সময় নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদের মতো নেতারা দলীয় সীমা ছাড়িয়ে জনপ্রিয়তা পান।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি ঢাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বিরোধী জোটের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী এই রূপান্তরকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন।
এই বিশ্লেষক আল জাজিরাকে বলেন, ‘বাস্তবে এনসিপি একটি স্বতন্ত্র তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার ব্যাপারে খুব কম আগ্রহ দেখিয়েছে। নির্বাচনের পর থেকে তারা জামায়াতের অবস্থান থেকে আলাদা কোনো স্পষ্ট কর্মসূচি তুলে ধরেনি এবং তাদের ছায়াতলে কাজ করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে বলে মনে হচ্ছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ‘এনসিপি শক্তিশালী ও স্বাধীন তৃতীয় শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।’ এর পেছনে সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এনসিপি একটি অস্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে। সংসদে আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি আছে, ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতীকী সংযোগও রয়েছে, তবে একই সঙ্গে তীব্রভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে জোট রাজনীতির পথ ধরে এগোচ্ছে। যা তাদের রাজনৈতিক বিচ্যুতিও ঘটাতে পারে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘নেতৃত্বকে তাদের কাজের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা উচিত। তার ভাষ্য, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল একটি পরীক্ষা এবং এনসিপি এখন বাংলাদেশের ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।’
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ছয়টি আসন আদৌ তৃতীয় শক্তিতে রূপ নেবে কিনা, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। দলটি জোট রাজনীতির বাইরে নিজেদের বিস্তৃত করতে পারবে কিনা, তৃণমূল সংগঠন জোরদার করে আরও সুস্পষ্ট আদর্শিক অবস্থান তুলে ধরতে সক্ষম হবে কি না—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নবোদয়/ জেডআরসি/ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬