বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৬:৪৬ এএম
শেয়ার করুন:

সার্বভৌমত্ব একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব নীতি, আইন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ স্বাধীনতা। এটি শুধু ভূ-রাজনৈতিক সীমানার অস্তিত্ব নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামাজিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ক্ষমতাকেও নির্দেশ করে। সার্বভৌম রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র যা আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নিজেকে সমান মর্যাদায় উপস্থাপন করতে পারে এবং যার নীতিনির্ধারণে বাইরের কোনো শক্তি বাধ্যতামূলক হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই স্বাতন্ত্র্যের বাস্তবচিত্র প্রায়শই জটিল। দেশের বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প, অবকাঠামো বিনিয়োগ, শক্তি ও বাণিজ্য নীতি, এমনকি কূটনৈতিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে বিদেশি শক্তির প্রভাব স্পষ্ট।
চীনের বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বা রেল প্রকল্পে, সেখানে চীনের আর্থিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা থাকলেও চুক্তির শর্তাবলী এবং ঋণের শর্ত অনেক সময় দেশের দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্ধারণকে সীমিত করে।
একইভাবে, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্য বিষয়ক সমঝোতা প্রায়শই কূটনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে আনা হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় উন্নয়ন সহায়তাও প্রায়শই নির্দিষ্ট শর্তের সঙ্গে আসে, যা দেশের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন আসে, আমরা কি কৌশলগত অংশীদার নাকি চাপে থাকা দেশ? উত্তর সহজ নয়। দেশের অবস্থান প্রায়শই দুটি অবস্থার সংমিশ্রণ। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং চুক্তির মাধ্যমে আমরা কৌশলগত সুবিধা পেতে পারি, যেমন প্রযুক্তি স্থানান্তর, বাণিজ্যিক সুযোগ বা বৈদেশিক বিনিয়োগ।
অন্যদিকে, এই সহযোগিতা বা বিনিয়োগের শর্ত কিছু ক্ষেত্রে দেশের নীতিনির্ধারণে বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে ঋণ ও প্রযুক্তি প্রদানকারী দেশের স্বার্থও বিবেচনা করতে হয়। ফলে দেশের সিদ্ধান্ত প্রায়শই স্বাধীন ও সংগতিপূর্ণ মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পায়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের ভাবমূর্তি। বিদেশি প্রভাবের স্বীকারোক্তি অনেক সময় দেশের সার্বভৌমত্ব হ্রাসের চিহ্ন হিসেবে গণ্য হয়। ফলে নীতি নির্ধারণকারীরা সচরাচর এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনার থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সার্বভৌমত্ব মানে সীমান্তের অস্তিত্ব নয়। এটি নীতিনির্ধারণে স্বাধীনতা ও দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার ক্ষমতা।
বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানও অনন্য। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতায় একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে আমাদের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক চাপে প্রভাবিত হয়। তবে দেশের নীতি নির্ধারণে যে স্বাধীনতা থাকে, তা ব্যবহার করে আমরা কৌশলগত অংশীদারিত্বকে দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করি।
উদাহরণস্বরূপ, বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার সময় আমরা রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহে বৈচিত্র আনি, যাতে কোনো এক দেশ বা জোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না হয়।
সংক্ষেপে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কেবল ভূ-রাজনৈতিক সীমানার অধিকার নয়। এটি নীতিনির্ধারণে স্বাধীনতা এবং বিদেশি চাপ থাকা সত্ত্বেও দেশের স্বার্থ রক্ষার ক্ষমতা। এটি শুধুই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়। এটি দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ০৫ জানুয়ারি ২০২৬