বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৬:৪০ এএম
শেয়ার করুন:
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মুহূর্ত খোদাই করা থাকে, যা আপাতদৃষ্টিতে মুক্তির বার্তা নিয়ে এলেও তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে পরাধীনতার এক নির্মম ও বিভীষিকাময় অধ্যায়। কল্পনা করুন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যার রাজধানীর আকাশে হঠাৎ ভিনদেশি যুদ্ধবিমানের গর্জন, বোমার আঘাতে প্রকম্পিত মাটি, আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতর থেকে একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে বিদেশি সৈন্যরা।
দৃশ্যটি যদি ভেনেজুয়েলার না হয়ে বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তের হতো, তবে একে নিঃসন্দেহে নগ্ন আগ্রাসন বা সার্বভৌমত্বের ওপর নৃশংসতম আঘাত বলে চিহ্নিত করা হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই অদ্ভুত সময়ে দাঁড়িয়ে ভেনেজুয়েলার বুকে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে তথাকথিত মুক্তি হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে, যা আসলে একটি জাতির জন্য ভয়াবহতম ট্র্যাজেডির পূর্বাভাস মাত্র।
মাদুরো সরকারের দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা বাস্তব। কিন্তু একজন অ-জনপ্রিয় শাসকের পতনই যদি গণতন্ত্র হয়, তবে ইতিহাস এত নিষ্ঠুর কেন? বাস্তবিক অর্থে শাসক বদলালেই শাসনের চরিত্র বদলায় না, যদি পরিবর্তনের নিয়ন্ত্রণ দেশের মানুষের হাতে না থাকে।
ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সৃষ্টি হওয়া উল্লাসের মূল কারণ রাজনৈতিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা, ধারাবাহিক ব্যর্থ আন্দোলন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুরতায় তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ‘কীভাবে’ পরিবর্তন আসছে তা আর গুরুত্বপূর্ণ নয়; শুধু চায় পরিবর্তনটা হোক। এই মরিয়া মানসিকতা থেকেই বিদেশি হস্তক্ষেপকেও তারা নিজেদের বিজয় বলে মনে করছে।
তবে বিদেশি শক্তি কখনো জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আসে না, আসে নিজেদের স্বার্থ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যই তার প্রমাণ। তিনি ‘গণতন্ত্র’ নিয়ে কোন শব্দ উচ্চারণ করেননি, বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে কার্যত উপেক্ষা করেছেন, বরং নিষেধাজ্ঞাভুক্ত দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
বার্তাটি পরিষ্কার—নীতির নয়, প্রয়োজনের রাজনীতি। মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর আজ যারা উল্লাস করছে, তারা বিশ্বাস করছে তারা আলাদা, তারা নিরাপদ, তাদের সঙ্গে মাদুরোর মতো আচরণ করা হবে না। শাসনের কাঠামোতে এই বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ ক্ষমতার ভাষা বদলায় না, শুধু শত্রুর তালিকা বদলায়। গতকাল যারা স্বৈরাচারের বিরোধী ছিল, আগামীকাল তারাই হতে পারে স্থিতিশীলতার শত্রু।
যদি শাসকের নাম বদলায়, কিন্তু সিদ্ধান্তের কেন্দ্র দেশের বাইরে থাকে; যদি জনগণের ভোট নয়, বিদেশি আনুগত্যই ক্ষমতার শর্ত হয়—তাহলে সেই পরিবর্তন মুক্তি নয়, শুধু নতুন বন্দিত্ব। বিদেশি সেনা এসে যে প্রেসিডেন্টকে তুলে নেয়, সে দেশে কেউই প্রকৃত বিজয়ী হয় না। বিজয়ের উল্লাস তখন আসলে ভবিষ্যৎ পরাজয়ের অজান্ত ঘোষণা মাত্র।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ০৫ জানুয়ারি ২০২৬