উত্তর কোরিয়া
অপরাধীর সন্তান এবং বাবা-মাকেও অপরাধের ভাগীদার হতে হয়। সভ্য জগতের ইতিহাসে বংশপরম্পরায় শাস্তি দেওয়ার এমন উদাহরণ বিরল। এই নিষ্ঠুর প্রথা মূলত নাগরিকদের মনে এমন এক স্থায়ী ভয়ের সঞ্চার করে, যাতে কেউ রাষ্ট্র বা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করার সাহস না পায়।
বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১২:০৯:৪৪ পিএম
শেয়ার করুন:

রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা
একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে যখন বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন এবং অবাধ তথ্যের জয়জয়কার, তখন পূর্ব এশিয়ার একটি ভূখণ্ড নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালের আড়ালে। দেশটির নাম উত্তর কোরিয়া।
কিম জং উনের নেতৃত্বাধীন এই রাষ্ট্রটি বিশ্ব মানচিত্রে কেবল একটি দেশ নয়, বরং ২৫ মিলিয়ন মানুষের জন্য এক বিশাল ‘উন্মুক্ত কারাগার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেশটির যে জনজীবন ও শাসনব্যবস্থা ফুটে উঠেছে, তা যেমন অদ্ভুত, তেমনি শিউরে ওঠার মতো।
উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থা কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দর্শনের চেয়ে একটি ‘ধর্মীয় কাল্ট’ বা উগ্র মতবাদের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। এখানে কিম পরিবারকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে। তাদের শাসনকে বৈধতা দিতে প্রবর্তন করা হয়েছে ‘জুচে’ মতবাদ, যার প্রভাব এতটাই গভীর যে দেশটির ক্যালেন্ডারও শুরু হয় প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সাং-এর জন্মসাল থেকে।
নেতার প্রতি আনুগত্য সেখানে কেবল শ্রদ্ধা নয়, বরং একটি বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় আইন। শোক প্রকাশে অনীহা বা নেতার ছবির অবমাননা সেখানে কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতা—যার পরিণতি হতে পারে অবর্ণনীয়।
উত্তর কোরিয়ার আইনব্যবস্থার সবচেয়ে অমানবিক দিক হলো ‘সম্মিলিত শাস্তি’ বা তিন প্রজন্মের সাজা। কোনো ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী হন, তবে তার শাস্তি কেবল তার ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না।
অপরাধীর সন্তান এবং বাবা-মাকেও অপরাধের ভাগীদার হতে হয়। সভ্য জগতের ইতিহাসে বংশপরম্পরায় শাস্তি দেওয়ার এমন উদাহরণ বিরল। এই নিষ্ঠুর প্রথা মূলত নাগরিকদের মনে এমন এক স্থায়ী ভয়ের সঞ্চার করে, যাতে কেউ রাষ্ট্র বা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করার সাহস না পায়।
বিশ্বের মানুষ যখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক ক্লিকেই পুরো পৃথিবীকে দেখছে, উত্তর কোরিয়ার মানুষ তখন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে নিজস্ব ‘ইন্ট্রানেট’ বা অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক, যার কাজ তথ্য সরবরাহ নয় বরং প্রোপাগান্ডা ছড়ানো।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি, সিনেমা বা গান সেখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এমনকি ‘নীল জিন্স’ পরার মতো তুচ্ছ বিষয়কেও সেখানে ‘পুঁজিবাদের বিষ’ হিসেবে দেখা হয়। তথ্যের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেশটির মানুষকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক কৃত্রিম বাস্তবতার মধ্যে আটকে রেখেছে।
উত্তর কোরিয়া নিজেকে সমাজতান্ত্রিক স্বর্গ হিসেবে দাবি করলেও, বাস্তবে দেশটির সমাজ ব্যবস্থা ‘সংবুন’ নামক এক কঠোর শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত। পূর্বপুরুষদের রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় একজন নাগরিকের ভাগ্য—সে কি সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবে নাকি শ্রম শিবিরের পঙ্কিলতায় ধুঁকে মরবে।
বিশ্বের কাছে নিজেদের শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ প্রমাণ করতে উত্তর কোরিয়া লিপ্ত থাকে অদ্ভুত সব প্রচারণায়। দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তে অবস্থিত ‘কিজং-ডং’ নামক ভুতুড়ে শহরটি এর এক অনন্য উদাহরণ। শূন্য এই শহরটি মূলত বিশ্বের চোখে ধুলো দেওয়ার একটি প্রোপাগান্ডা মাত্র।
অন্যদিকে, কৃষি সারের অভাব মেটাতে জনগণের ওপর ‘মলমূত্র কোটা’ চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি দেশটির চরম অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও প্রশাসনিক দেউলিয়াপনারই বহিঃপ্রকাশ।
উত্তর কোরিয়া আজ পারমাণবিক শক্তির আস্ফালন দেখিয়ে বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি মানবিকতার এক চরম পরাজয়। ভয়, ক্ষুধা এবং পরাধীনতার শেকলে বন্দি দেশটির প্রতিটি নাগরিক।
আধুনিক সভ্যতার সমান্তরালে এমন এক ‘নিষিদ্ধ গ্রহ’ বা ‘অন্ধকার জনপদ’ টিকে থাকা কেবল মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়, বরং বিশ্ব বিবেকের জন্য এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। উত্তর কোরিয়া আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা বিহীন একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার নিজ নাগরিকদের জন্য যমপুরীতে পরিণত হতে পারে।
নবোদয়/ আরআই/ জেআরসি/ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬