পুলিশের দায়বদ্ধতা: ভুল করলে ৭ বছরের জেল
‘শোন অ্যারেস্ট’ আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ হলেও এর অপব্যবহার নাগরিক জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে। খালাস পাওয়ার পর নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো কেবল পুলিশের মর্জির ওপর নয়, বরং অকাট্য প্রমাণের ওপর নির্ভর করবে।
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০১:০৩:২৬ পিএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ‘শোন অ্যারেস্ট’ শব্দটি সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। এক মামলার আসামি কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই তাকে অন্য এক বা একাধিক মামলায় গ্রেফতার দেখানোর যে সংস্কৃতি, তাকেই মূলত ‘শোন অ্যারেস্ট’ বলা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের নতুন আইনি সংশোধনীর পর এই প্রক্রিয়ায় এসেছে বিশাল পরিবর্তন।
‘শোন অ্যারেস্ট’ আসলে কী?
সহজ কথায়, একজন ব্যক্তি যখন একটি মামলায় ইতিমধ্যে কারাগারে আটক আছেন, তখন পুলিশ যদি মনে করে অন্য কোনো একটি মামলাতেও তার সম্পৃক্ততা আছে, তবে তাকে নতুন সেই মামলায় গ্রেফতার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করে।
আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করলে বলা হয়, ওই আসামিকে নতুন মামলায় ‘শোন অ্যারেস্ট’ (Shown Arrested) করা হয়েছে। এটি মূলত তদন্তের স্বার্থে করা হয়, যাতে আসামি কারাগার থেকে মুক্তি না পেয়ে নতুন মামলার বিচারের মুখোমুখি হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ধারা ৩৫১ (বিশেষত ৩৫১-এর ২ উপধারা)-এ শোন অ্যারেস্ট’ সম্পর্কে বলা হয়েছে । যদি কোনো ব্যক্তি আদালতে হাজির থাকেন এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত মনে করেন যে উক্ত ব্যক্তিই প্রকৃত অপরাধী তবে পুলিশ বা বিচারক পরোয়ানা ছাড়াই তাকে আটক (shown arrested) করতে পারেন।
নতুন আইনে ‘শোন অ্যারেস্ট’ কখন এবং কীভাবে করা যাবে?
১৬৭এ-ধারার নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, এখন চাইলেই পুলিশ কাউকে ‘শোন অ্যারেস্ট’ করতে পারবে না। এর জন্য তিনটি কঠিন পরীক্ষা পার হতে হবে:
শারীরিক উপস্থিতি: আগে আসামিকে কারাগারে রেখেই কাগজে-কলমে ‘শোন অ্যারেস্ট’ করা যেত। এখন আসামিকে সশরীরে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে।
সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ: শুধু সন্দেহের বশে আবেদন করলে হবে না। মামলার ডায়েরি (Case Diary) জমা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা আছে।
আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন: আসামিকে শুনানির সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ তার আইনজীবী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে যুক্তি দিতে পারবেন যে, কেন এই গ্রেফতার অবৈধ।
খালাস পাওয়ার পর অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো কতটা যৌক্তিক?
জনমনে প্রশ্ন, আদালত যখন একজনকে একটি মামলায় নিরপরাধ ঘোষণা করে খালাস দেয়, তখন কারাফটক থেকে তাকে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো কি আইনসম্মত?
১. আইনি দিক: তাত্ত্বিকভাবে, কোনো ব্যক্তি এক মামলায় খালাস পেলেও যদি অন্য কোনো বিচারাধীন মামলায় তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারে। আইন অনুযায়ী প্রতিটি অপরাধ আলাদা, তাই একটি থেকে খালাস পাওয়া মানেই অন্য সব অপরাধ থেকে মুক্তি পাওয়া নয়।
২. যৌক্তিকতা ও অপব্যবহার: সাধারণ ক্ষেত্রে এটি যৌক্তিক মনে হলেও বাংলাদেশে এর ব্যাপক অপব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। অনেক সময় দেখা যায়, একজন ব্যক্তি সব মামলা থেকে জামিন বা খালাস পাওয়ার পর জেল গেটে নতুন কোনো ‘গায়েবি মামলায়’ তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা একে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ এবং ‘ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী’ হিসেবে গণ্য করেন। এর ফলে একজন নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়।
৩. নতুন আইনের রক্ষাকবচ: ১৬৭এ-ধারা অনুযায়ী, এখন খালাস পাওয়া কোনো ব্যক্তিকে পুনরায় গ্রেফতার দেখাতে হলে পুলিশকে প্রমাণ করতে হবে আবেদনটি ‘ওয়েল ফাউন্ডেড’ বা সুপ্রতিষ্ঠিত। যদি কোনো সাক্ষী বা সহযোগী আসামির জবানবন্দিতে ওই ব্যক্তির নাম না থাকে, তবে ম্যাজিস্ট্রেট সেই আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেবেন।
পুলিশের দায়বদ্ধতা: ভুল করলে ৭ বছরের জেল
নতুন আইনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, পেনাল কোডের ২২০ ধারা। যদি কোনো তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজনৈতিক চাপে বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে খালাস পাওয়ার পর মিথ্যা অভিযোগে পুনরায় গ্রেফতার দেখানোর চেষ্টা করেন, তবে সেই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। দোষী সাব্যস্ত হলে ওই কর্মকর্তার ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
‘শোন অ্যারেস্ট’ আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ হলেও এর অপব্যবহার নাগরিক জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে। খালাস পাওয়ার পর নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো কেবল পুলিশের মর্জির ওপর নয়, বরং অকাট্য প্রমাণের ওপর নির্ভর করবে।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬