কুমিল্লার রামমালা গ্রন্থাগার
রামমালা গ্রন্থাগার সাধারণ কোনো বইয়ের গুদামঘর নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দুর্লভ এক রত্নভাণ্ডার। এখানে সংরক্ষিত আছে প্রায় ১২,০০০ মুদ্রিত বই এবং ৯,০০০-এর বেশি হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে কিছু পুঁথির বয়স ৩০০ থেকে ৪০০ বছর!
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১১:৪৪:০৪ এএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
গোমতী বিধৌত প্রাচীন জনপদ কুমিল্লা। শিক্ষা আর সংস্কৃতির এই উর্বর ভূমিতে, শহরের যান্ত্রিক কোলাহল যেখানে নিত্যসঙ্গী, ঠিক সেখানেই—শক্তলা মোড় ছাড়িয়ে মহেশাঙ্গনের শান্ত চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে এক নিস্তব্ধ মহাকাব্য। নাম তার—‘রামমালা গ্রন্থাগার’।
আধুনিকতার জৌলুস নেই, নেই ওয়াইফাই-এর অদৃশ্য মায়াজাল কিংবা টিকটকের চটকদার হাতছানি। অথচ, এই জরাজীর্ণ দেয়ালের ওপাশেই ঘুমিয়ে আছে শতবর্ষের এক অজানা ইতিহাস। যেন কালের সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ ঋষি।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে ফিরে যেতে হয় ১৯১২ সালে। শিক্ষানুরাগী ও দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে গড়ে তুলেছিলেন এই জ্ঞানের মিনার। মা ‘রামমালা দেবী’র নামানুসারেই এর নামকরণ। শুরুতে এটি ছিল ‘ঈশ্বর পাঠশালা’র একটি ছোট সংস্কৃত টোল।
কিন্তু মহেশচন্দ্রের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সংগ্রহশালা গড়তে, যা হবে এই বাংলার লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির ধারক। সেই স্বপ্ন থেকেই তিলে তিলে গড়ে ওঠে আজকের এই বিশাল গ্রন্থাগার, যা বর্তমানে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে টিকে আছে কোনোমতে।
রামমালা গ্রন্থাগার সাধারণ কোনো বইয়ের গুদামঘর নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দুর্লভ এক রত্নভাণ্ডার। এখানে সংরক্ষিত আছে প্রায় ১২,০০০ মুদ্রিত বই এবং ৯,০০০-এর বেশি হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে কিছু পুঁথির বয়স ৩০০ থেকে ৪০০ বছর!
তালপাতা, তুলট কাগজ কিংবা গাছের ছালের ওপর কালির আঁচড়ে লেখা ধর্ম, দর্শন, আয়ুর্বেদ আর ইতিহাসের সেই সব কথা—যা গুগলের অ্যালগরিদমও খুঁজে পায় না। মহাভারত, রামায়ণ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের কবিগান—কী নেই এখানে?
পেনসিলভেনিয়া থেকে জাপান, কিংবা সুদূর আয়ারল্যান্ড—জ্ঞানপিপাসু গবেষকরা বারবার ছুটে এসেছেন এই মহেশাঙ্গনের ধুলোমাখা বারান্দায়, কেবল একটু ঘ্রাণ নিতে সেই প্রাচীন ঐশ্বর্যের।
কিন্তু হায়! রত্ন চিনতে ভুল করা আমাদের জাতিসত্তার এক করুণ প্রতিচ্ছবি আজ এই গ্রন্থাগার। কালের নির্মম করাল গ্রাস আর দীর্ঘদিনের অযত্ন—আজ ধুলোর আস্তরণে ঢেকে দিয়েছে এর জৌলুস। চুরির আশঙ্কায় আজ এর দরজা সাধারণের জন্য রুদ্ধ। ভেতরে ধুঁকছে অমূল্য সব পাণ্ডুলিপি, যেন প্রতিটি অক্ষর অন্ধকারে ডুকরে কাঁদছে।
মহেশাঙ্গনের এই ভবনটি আজ এক নিঃসঙ্গ নাবিক, যে তার বুকের ধন আগলে রেখেও কূল পাচ্ছে না। স্থানীয়রাই জানে না, তাদের বাড়ির পাশেই, এই শক্তলার মোড়েই অযত্নে পড়ে আছে এক আনকাট হীরা।
তবে কি হারিয়ে যাবে এই ইতিহাস? নাকি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পাবে মৃতপ্রায় এই অক্ষরগুলো? বিশেষজ্ঞরা বলছেন—যদি ধুলো ঝেড়ে এই রত্নগুলোকে ডিজিটাল আলোর ভুবনে আনা যায়, তবে রামমালা গ্রন্থাগার হতে পারে বিশ্বমানের এক গবেষণা কেন্দ্র।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬