আবেগের শূন্যতায় বেড়ে ওঠছে শিশু
রাষ্ট্রীয়ভাবে এই কাঠামোগত শূন্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ডে-কেয়ার সংকট। ১৬ কোটি মানুষের দেশে সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আছে মাত্র ৬৩টি! নীতিনির্ধারকদের এই চরম ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছেন নারীরা।
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০২:০৩:২১ পিএম
শেয়ার করুন:

আদিত্য আজাদ, ঢাকা
ঢাকায় শৈশব এখন আর স্বাভাবিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় নেই। এটি রূপান্তরিত হয়েছে কর্মজীবী বাবা-মায়ের সাপ্তাহিক ছুটির দিনের ‘উইকএন্ড প্রজেক্টে’। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, আবাসন ও শিক্ষা ব্যয় মেটানোর পর স্বামী-স্ত্রীর চাকরি এখন আর কোনো সামাজিক উত্তরণের প্রতীক নয়, এটি স্রেফ টিকে থাকার গাণিতিক সমীকরণ।
অপরিকল্পিত নগরায়ণে গ্রাম থেকে আসা পরিবারগুলোর বর্তমান ঠিকানা ১২০০ স্কয়ার ফিটের কিছু কংক্রিটের বাক্স। রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের সর্বোচ্চ মুনাফার লোভে তৈরি এসব ভবনে কোনো শেয়ার্ড কমিউনিটি স্পেস বা উঠান নেই। এই স্থাপত্যগত একাকীত্বে পুরোনো যৌথ পরিবারের নিরাপত্তাও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন, ফলে সন্তান পালনে বাবা-মায়েরা আজ এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা।
এই টিকে থাকার লড়াইয়ে শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত সময় প্রায় শূন্য। যন্ত্রের সঙ্গে শিশুদের সখ্যতা গড়ে উঠছে। ফলে প্রাকৃতিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সেই শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে। বুয়েটের এআরআই-এর তথ্যমতে, যানজট প্রতিদিন কর্মজীবীদের ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা কেড়ে নিচ্ছে।
দুর্নীতিগ্রস্ত নগর পরিকল্পনায় এটি স্রেফ যানজট নয়, এটি শিশুদের প্রাপ্য সময় থেকে রাষ্ট্রের সরাসরি চুরি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অফিসে ‘টক্সিক প্রেজেন্টিজম’ বা বসের চোখে নিবেদিতপ্রাণ সাজার জন্য রাত পর্যন্ত ডেস্কে পড়ে থাকার এক সামন্তবাদী সংস্কৃতি।
দেশে ‘রাইট টু ডিসকানেক্ট’ আইন না থাকায়, রাতে ঘরে ফিরে সন্তানের পাশে বসলেও হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের কারণে অভিভাবকরা মানসিকভাবে নিখোঁজ থাকেন। সপ্তাহের পাঁচ-ছয় দিন শক্তির ৮০ শতাংশ কর্পোরেট চাকায় পিষ্ট করে, তারা ৪৮ ঘণ্টার উইকএন্ডে এক সপ্তাহের অভিভাবকত্ব পুষিয়ে দেওয়ার এক অবাস্তব রুটিনে প্রবেশ করেন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে এই কাঠামোগত শূন্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ডে-কেয়ার সংকট। ১৬ কোটি মানুষের দেশে সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আছে মাত্র ৬৩টি! নীতিনির্ধারকদের এই চরম ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছেন নারীরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সন্তান রাখার নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অন্তত ১৮ শতাংশ কর্মজীবী অভিভাবক—যাদের সিংহভাগই নারী—ক্যারিয়ার ছাড়তে বাধ্য হন। আর রাষ্ট্র অত্যন্ত নির্লজ্জের মতো এই সিস্টেমিক ছাঁটাইয়ের নাম দেয় ‘নারীর ব্যক্তিগত পারিবারিক সিদ্ধান্ত’।
যাদের চাকরি ছাড়ার উপায় নেই, তাদের ভরসা ‘শ্যাডো ডে-কেয়ার’। বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা তারিকুল ইসলামের ভাষায়, ‘কোচিং সেন্টারগুলো আসলে আমাদের কাছে পেইড সিকিউরিটি গার্ড। রাত আটটায় অফিস থেকে ফেরা পর্যন্ত বাচ্চাকে নিরাপদে আটকে রাখাই তাদের মূল কাজ।’
গোদের ওপর বিষফোঁড়া হলো ১৯৫০ সালের পুরনো শিক্ষাব্যবস্থা, যা কর্মজীবী অভিভাবকদের বাস্তবতার তোয়াক্কা না করে মাঝরাতে কার্ডবোর্ড কেটে স্কুলের প্রজেক্ট বানাতে বাধ্য করে। শিশুদের জীবন এখন কেবল স্কুল থেকে কোচিংয়ের এক যান্ত্রিক চক্রে বন্দি। মানসিক পরিপক্বতা এবং স্বনির্ভরতার চেয়ে এ-প্লাস পাওয়াটাই এখন সমাজের কাছে একমাত্র মাপকাঠি।
এদিকে শহরের খেলার মাঠগুলো গিলে খেয়েছে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা। যেটুকু ফাঁকা জায়গা অবশিষ্ট আছে, সেখানেও নিরাপত্তার অভাবে অভিভাবকরা সন্তানদের বাইরে ছাড়তে সাহস পান না। ফলে শিশুদের জমে থাকা শক্তি দৌড়ঝাঁপ করে ইতিবাচকভাবে খরচ করার কোনো সুযোগ নেই।
কর্পোরেট মলগুলো এই সুযোগে মধ্যবিত্তের কাছে ঘণ্টা চুক্তিতে বিক্রি করছে ‘খেলার সময়’। ১২ ঘণ্টার জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত বাবা-মায়ের পক্ষে রাতে রান্না করা অসম্ভব, তাই ফুড ডেলিভারি অ্যাপের হাত ধরে নীরবে ঢুকছে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মহামারি।
শারীরিক ও মানসিকভাবে নিঃশেষিত অভিভাবকরা নিজেদের বাঁচাতে শিশুদের হাতে তুলে দেন ডিজিটাল বেবিসিটার— স্মার্টফোন। রাষ্ট্র যখন তরুণদের সুস্থ বিনোদন দিতে ব্যর্থ, তখন ইউটিউবের অ্যালগরিদম আর টেক জায়ান্টরাই একপ্রকার বিনা বাধায় হয়ে উঠছে আগামী প্রজন্মের নৈতিকতার শিক্ষক।
বাবা-মায়ের এই দীর্ঘমেয়াদী অনুপস্থিতি এবং আবেগের শূন্যতায় বেড়ে ওঠা শিশুরা ধৈর্য বা দ্বন্দ্ব নিরসনের কোনো বাস্তব শিক্ষা পায় না। ফলে জমে থাকা শক্তি ও নিঃসঙ্গতায় হাঁপিয়ে ওঠা শিশুরা যখন স্বাভাবিক আবেগীয় বিকাশ থেকে বঞ্চিত হয়ে পাবলিক স্পেসে অস্বাভাবিক আচরণ করে, তখন সমাজ সিস্টেমকে বাদ দিয়ে খোদ শিশুকেই দোষারোপ করে।
আর ঠিক এই সুযোগটি নিচ্ছে চিকিৎসা খাত। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দীন আহমেদ স্পষ্ট বলেন, ‘শিশুদের এই জেদ বা অস্বাভাবিক আচরণ কোনো ক্লিনিক্যাল রোগ নয়। চার দেয়ালে বন্দি থেকে শক্তি খরচ করতে না পারা এবং বাবা-মায়ের দীর্ঘমেয়াদী অনুপস্থিতির এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।’
একটি শোষণমূলক ব্যবস্থাকে মেরামত করে শিশুদের খেলার মাঠ বা অভিভাবকের সময় ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে, তাদের হাতে ওষুধের প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কারণ, রাষ্ট্র বা কর্পোরেট কাঠামোর ত্রুটি স্বীকার করার চেয়ে, একটি অবহেলিত শিশুকে ‘রোগী’ বানিয়ে ওষুধ বিক্রি করা ফার্মাসিউটিক্যাল বাজারের জন্য অনেক বেশি লাভজনক। ঢাকার এই রূঢ় বাস্তবতা প্রমাণ করে— শহরটি শিশুদের বড় হওয়ার জন্য বানানোই হয়নি, এটি কেবলই সস্তায় শ্রম শুষে নেওয়ার এক দানবীয় কারখানা।
নবোদয়/ এএ/ জেডআরসি/ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬