উপার্জন ঠাঁই দাঁড়িয়ে, খরচ বাড়ছে লাফিয়ে
চাল ডিম সবজি—যা নেন তা-ই হাতে নিয়ে ভাবতে হয়, খাবেন, নাকি মাইনের হিসেব বাঁচাবেন। মাঝারি মানের চাকরি করা মানুষগুলো সবচেয়ে বিপদে, কারণ তাদের বেতন বাড়ার গতি দাঁড়িয়ে থাকে, আর বাজার হয় ছুটন্ত ঘোড়া।
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০৫:০২:১১ পিএম
শেয়ার করুন:

রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা
চাল ডিম সবজি—যা নেন তা-ই হাতে নিয়ে ভাবতে হয়, খাবেন, নাকি মাইনের হিসেব বাঁচাবেন। মাঝারি মানের চাকরি করা মানুষগুলো সবচেয়ে বিপদে, কারণ তাদের বেতন বাড়ার গতি দাঁড়িয়ে থাকে, আর বাজার হয় ছুটন্ত ঘোড়া।
ঢাকার রামপুরায় বসবাসকারী ৩২ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মকর্তা জারিফ রহমান জানালেন, গত দুই বছরে তার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ, কিন্তু বেতন বেড়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। বেতন হাতে পাওয়ার আগে হিসাব টেনে দেখি, প্রায় সবটাই চলে যাচ্ছে খরচের খাতায়। শুধু জারিফ নয়, একই বক্তব্য পোশাকখাত থেকে বেসরকারি অফিসে কর্মরত সবার-ই।
দেশের মাঝারি ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীরা বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। মুদ্রাস্ফীতি, বাড়িভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও চিকিৎসা–যাতায়াত খরচের এই লাগামহীন বেড়ে যাওয়া তাদের মাসিক বাজেটকে চরমভাবে সংকটে ফেলেছে। বেতনের সঙ্গে খরচের ফারাক এতটাই বেড়ে গেছে যে, অনেকেই বাধ্য হয়ে ধার-দেনা, সঞ্চয় ভাঙা বা জীবনযাত্রার মান কমিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশে এখন আয়-ব্যয়ের হিসেব মিলানো মানে বালুর বস্তা দিয়ে নদীর স্রোত ঠেকানোর চেষ্টা। বেতন বাড়ছে বছরের শেষে একটা প্রতীকী ঘোষণায়, কিন্তু বাজারদর সকালে গিয়ে দেখলে মনে হয়, রাতে কোনো অদৃশ্য শক্তি সব দামে আগুন দিয়ে গেছে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে সরকারি ব্যাখ্যাগুলো এখন মানুষের কানে ঢোকে না; ঢোকে বাজারের ঝাঁঝ। পরিসংখ্যানে লেখা থাকে ৯ শতাংশ, কিন্তু বাজারে ঢুকলে মনে হয় অন্তত তিরিশ।
চাল ডিম সবজি—যা নেন তা-ই হাতে নিয়ে ভাবতে হয়, খাবেন, নাকি মাইনের হিসেব বাঁচাবেন। মাঝারি মানের চাকরি করা মানুষগুলো সবচেয়ে বিপদে, কারণ তাদের বেতন বাড়ার গতি দাঁড়িয়ে থাকে, আর বাজার হয় ছুটন্ত ঘোড়া।
তরুণ প্রজন্মের অবস্থা আরও বেদনাদায়ক। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকরি তো মিলছে, কিন্তু সেই চাকরির বেতন দিয়ে ঢাকায় মাস কাটানো মানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হিসাবের অ্যাডভেঞ্চার। মাসের ৩০ হাজার টাকা বেতন আসে, ১৫ হাজার চলে যায় বাসা ভাড়ায়।
যাতায়াত আর বাজারে খরচ করলে হাতে থাকে শূন্যের কাছাকাছি। নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন—সঞ্চয়, নিজের কিছু করা—সব মিলিয়ে বেতন হাতে পাওয়ার দিনেই মরে যায়। তারা এখন ক্যারিয়ার বানাতে চায় কিনা, সে প্রশ্নের আগেই ভাবছে, পরের মাস কীভাবে টিকবে।
ঢাকা শহরের বাসাভাড়া যেন এক ধরনের বৈধ অত্যাচার। বাড়িওয়ালারা যেন নিজেদের আলাদা কোনো অর্থনীতি চালান। সামান্য দুই রুমের বাসার জন্য ১২–১৭ হাজার চাওয়া হয়, যেন ভাড়াটিয়া মানেই টাকা ছাপার মেশিন।
তিন রুম হলে ২০ হাজারের নিচে কিছু নেই। তার ওপর সার্ভিস চার্জ, গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানি—সব মিলিয়ে বেতনের অর্ধেকই গিয়ে পড়ে এক মালিকের হাতে। বাড়িওয়ালারা বছরের শুরুতে ভাড়া বাড়ানোর যে অদ্ভুত উৎসব করেন, সেটাকে মানুষ ভয়ে আর নাম দিতে চায় না। প্রশ্নটা খুব সহজ— যে দেশে বেতন স্থির, সেখানে ভাড়া বাড়ার উৎস কোথায়?
মধ্যবিত্তের জীবনে ‘লাইফস্টাইল’ মানেই যেন বিলাসিতা। তাদের কাছে আছে শুধু প্রতিদিন বাঁচার লড়াই। বাইরে খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, পরিবারের সাথে একটু নিঃশ্বাস নেওয়া—সবই এখন অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা।
বাজারের ব্যাগ তুলে নিয়ে মানুষ যখন বাসায় ফেরে, মুখে কোনো আলাপ থাকে না, থাকে শুধু টেনশন। অনেক পরিবার সঞ্চয় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে, কিছু পরিবার চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে, আর কিছু পরিবার সন্তানদের টিউশন পর্যন্ত কেটে দিয়েছে। এ যেন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা জীবন।
সব মিলিয়ে একটা বড় প্রশ্ন—আয়-ব্যয়ের এই উল্টো সমীকরণ আর কতদিন চলবে? যদি বেতন না বাড়ে, বাজারের আগুন না থামানো যায়, আর বাসাভাড়া আরেক দফা ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে মধ্যবিত্ত নামে যে শ্রেণিটা আছে, তারা কি টিকে থাকবে? নাকি তারা নিম্নবিত্তের বলয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেবে?
অর্থনীতির লাগামহীন এই চাপ চাকরিজীবী সমাজকে সীমাহীন দুর্দশায় ঠেলে দিয়েছে। বেতনের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের এমন অমিল শুধু তাদের দৈনন্দিন জীবনে নয়, সমাজ–অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬