সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভবিষ্যত কি
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া রাষ্ট্রপতির গেজেটকে সরাসরি প্রশাসনিক আদেশ বলে চিহ্নিত করেছেন এবং একে ‘অবৈধ’ বলছেন। তাঁর যুক্তি স্পষ্ট, রাষ্ট্রপতির পক্ষে কোনো সাংবিধানিক আদেশ দেওয়ার আইনগতভাবে কোনো এখতিয়ার নেই এবং এটা পার্লামেন্টারি ফর্ম অব গভর্নমেন্টের ধারণারও বাইরে।
মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০৩:০৮:৪০ পিএম
শেয়ার করুন:

রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা
নানা চড়াই-উৎরাইয়ের পর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবার এমপি নির্বাচন ছাড়াও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে এখন দুটি শব্দ, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ। গণভোটে ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে।
কিন্তু এই সংখ্যা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ মসৃণ করেনি, বরং রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক আদেশে গেজেট জারি, সংসদ সদস্যদের দ্বিতীয়বার শপথ, নোট অব ডিসেন্টের অনুপস্থিতি এবং গণভোটের প্রশ্নমালার কাঠামো মিলিয়ে জন্ম দিয়েছে এক জটিল সাংবিধানিক ধাঁধার।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, রাষ্ট্রপতির এ ধরনের পরিষদ গঠনের এখতিয়ার আছে কিনা এবং এই পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করলে তা সংবিধানেরই লঙ্ঘন হবে কিনা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া রাষ্ট্রপতির গেজেটকে সরাসরি প্রশাসনিক আদেশ বলে চিহ্নিত করেছেন এবং একে ‘অবৈধ’ বলছেন। তাঁর যুক্তি স্পষ্ট, রাষ্ট্রপতির পক্ষে কোনো সাংবিধানিক আদেশ দেওয়ার আইনগতভাবে কোনো এখতিয়ার নেই এবং এটা পার্লামেন্টারি ফর্ম অব গভর্নমেন্টের ধারণারও বাইরে।
সমস্যা আরও গভীরে। অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়েছে, সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকে কাজ করেছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে, নির্বাচনও হয়েছে সেই একই সংবিধানের আওতায়। এখন সেই একই কাঠামো থেকে সংবিধান ভেঙে ফেলার চেষ্টাকেই দ্বিচারিতা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার ভাষায়, আপনি যখন একবার বিদ্যমান নিয়ম মানতে শুরু করলেন, চেরি পিকিং করার আর কোনো সুযোগ নেই। এইটুকু নিলাম, ওইটুকু নিলাম না এ ধরনের দ্বিচারিতার কোনো সুযোগ নাই।
কেউ কেউ অবশ্য শুরু থেকেই ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। লেখক ফরহাদ মজহারসহ একাংশ চেয়েছিলেন, ৫ই আগস্টের পর বিপ্লবী সরকার গঠন করে বিদ্যমান সংবিধান সরাসরি বাতিল ঘোষণা করা হোক। জ্যোতির্ময় বড়ুয়াও মনে করেন, শুরুতেই সেটা করা হলে এই প্রশ্নগুলো এখন উঠত না। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে বিদ্যমান কাঠামোয় প্রবেশের পর এখন সেই কাঠামোকেই ভাঙার চেষ্টা, এটাই মূল সংকট।
নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ নিয়েছেন এই বিষয়টিকেই সবচেয়ে বড় আইনি সমস্যা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীন বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন, সংবিধানের মাধ্যমে আপনি এমপি হওয়ার শপথ নিলেন। পরের শপথটা নিতে পারেন না যে, আমি সংবিধানটা ভাইঙা ফালাইবো। তাহলে আপনার আগের শপথটা বাতিল হয়ে যায়।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এই দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করেন, রাষ্ট্রপতির আদেশেই এই সংবিধানটাকে পরিবর্তন করার জন্য দ্বিতীয়বার আরেকবার শপথ নেবেন। সেটা এই সংবিধানের সাথেই তো বেঈমানি হয়ে গেল। তিনি উপমা দেন গাছের আগায় বসে গোড়া কাটার মতো ব্যাপার। উঠলেন যে গাছের গোড়া দিয়ে, সেটা কেটে ফেলবেন।
গণভোটের কাঠামোগত ভিত্তি নিয়েও কম প্রশ্ন নেই। সাধারণত গণভোটে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে মতামত নেওয়া হয়। কিন্তু এবার চারটি প্রশ্ন রাখা হয়েছে এবং সব প্রশ্নে একসঙ্গে 'হ্যাঁ' অথবা 'না' দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন ছিল।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এই কাঠামোকে ‘গোঁজামিল’ বলে উল্লেখ করেন এবং অস্ট্রেলিয়ার নজির টানেন, যেখানে ২০২৩ সালে একইরকম অস্পষ্ট প্রশ্নমালার কারণে গণভোট বাতিল হয়েছিল। তিনি বলেন, সাধারণ জনগণের আসলে বোঝাবুঝির সুযোগই ছিল না যে, তারা কীসে ‘হ্যাঁ’ দিচ্ছে, আর কোনটাতে ‘না’ দেবে।
এর ওপর আরেকটি বিতর্ক, সরকার নিজেই ব্যালটে ‘হ্যাঁ’-এর পাশে ঠিক চিহ্ন দিয়ে ভোটারদের স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। নিরপেক্ষ গণভোটের ধারণার সঙ্গে এটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেই প্রশ্নও উঠছে।
জুলাই সনদ প্রণয়নে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট অংশ নিয়েছে। ১৬৬টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৮২টি বাদ পড়েছে দলগুলোর আপত্তিতে। অবশিষ্ট ৮৪টি প্রস্তাব সনদে অন্তর্ভুক্ত হলেও বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে সই করেছে। কিন্তু গেজেট প্রকাশের সময় এই ভিন্নমতগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি যা পুরো ঐকমত্যের দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নোট অব ডিসেন্ট থাকলে আসলে চার্টার তৈরি করার সুযোগ নাই। এটাই হচ্ছে বেসিক জায়গায় গলদ, বলেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি আরও যোগ করেন, যখন আপনি বলছেন মতৈক্যে পৌঁছানো যায়নি যেটাতে পৌঁছানো যায়নি, সেটাতে জনগণের মতামত নেওয়ার কিছু নেই।
২১২ আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিএনপি জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। জামায়াত জোটের ৭৭ জন শপথ নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী, পরিষদ পরিচালনায় ন্যূনতম ৬০ জন সদস্য প্রয়োজন সংখ্যার হিসেবে কোরাম পূরণ সম্ভব। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠকে বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের রাজনৈতিক বৈধতা থাকে না।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ধরেন ৬০ হলেই কোরাম পূর্ণ হয়, ওরা আবার বসে গেল সংবিধান সংশোধন করতে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ গণভোটের অর্ডিন্যান্সটাকেই বাতিল করে দিলো। তারপর? জটিল ব্যাপার।
গণভোটের বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যে হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়েছে। সংস্কার প্রক্রিয়ার অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিত্ব বদিউল আলম মজুমদার স্বীকার করছেন এখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। মামলার রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
বিএনপি বলছে, সংস্কার চালিয়ে যাবে, তবে সংসদীয় প্রক্রিয়ায়। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতিগত দিক নিয়ে কাজ করতে হবে। সংসদ শুরু হলে আলাপ আলোচনা করবো।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া অবশ্য এখনও সমাধানের পথ দেখছেন, বিদ্যমান সংসদই এগুলো নিয়ে আলোচনা করে, সাংবিধানিক বিধিব্যবস্থা মেনে, যতটুকু যেভাবে পরিবর্তন করা যায় সেভাবে করতে পারবেন। বের হয়ে আসার সুযোগ আছে।
সবমিলিয়ে গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক কেবল আইনি নয়, এটি এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনমতের প্রকৃত অর্থ নিয়ে মৌলিক এক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।
একদিকে 'গণঅভ্যুত্থান-উদ্ভূত বৈধতার' দাবি, অন্যদিকে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো মেনে সেই কাঠামোকেই অস্বীকার করার আইনি ও নৈতিক সংকট এই দুইয়ের মাঝে আটকে আছে বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কারের ভবিষ্যৎ।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬