ক্ষমতার নেপথ্যে লালসা
যখন একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ধারাবাহিকভাবে একজন শিশুকে তার ধর্ষণকারী বা নির্যাতনকারীর হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে ‘আইনি বৈধতা’ খুঁজে পায়, তখন সেটি আর কোনো বিচারব্যবস্থা থাকে না। পরিষ্কার ভাষায় বলতে গেলে, এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলা একটি মানবপাচার চক্র।
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১১:৫৫:২০ এএম
শেয়ার করুন:
আদিত্য আজাদ, ঢাকা
৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬—পাকিস্তানের ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত বিচারব্যবস্থার নামে স্রেফ ‘জালিয়াতির’ এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল ১৩ বছর বয়সী এক খ্রিস্টান মেয়ে, মারিয়া শাহবাজ। তাকে অপহরণ করা হয়েছিল, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল এবং ৩০ বছর বয়সী এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সাথে জোর করে বিয়েও দেওয়া হয়েছিল।
মেয়েটির পরিবার আদালতে সরকারি জন্মনিবন্ধন উপস্থাপন করেছে। এমনকি স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এই বিয়ের কোনো আইনি রেকর্ড তাদের কাছে নেই। এতসব প্রমাণের পরও বিচারপতি করিম খান আঘা এবং সৈয়দ হাসান আজহার রিজভী কী করলেন?
তারা স্রেফ শিশুটিকে তার অপহরণকারীদের হাতেই তুলে দিলেন। ছয় মাস বন্দিদশায় আটকে থাকার পর একটি ১৩ বছরের শিশু যখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আদালতে দাঁড়িয়ে বলল যে, সে ‘স্বেচ্ছায় বিয়ে’ করেছে, এই বিজ্ঞ বিচারকরা হাসিমুখে সেই বয়ান মেনে নিলেন।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২০ সালে ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল ১৪ বছর বয়সী মায়রা শাহবাজের ক্ষেত্রেও। সেইবারও আদালত মেয়েটির জন্মনিবন্ধন চতুরতার সাথে এড়িয়ে গিয়ে অপহরণকারীকেই আইনি হেফাজত দিয়েছিল।
যখন একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ধারাবাহিকভাবে একজন শিশুকে তার ধর্ষণকারী বা নির্যাতনকারীর হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে ‘আইনি বৈধতা’ খুঁজে পায়, তখন সেটি আর কোনো বিচারব্যবস্থা থাকে না। পরিষ্কার ভাষায় বলতে গেলে, এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলা একটি মানবপাচার চক্র।
এই প্রাতিষ্ঠানিক নোংরামি কেবল আদালতের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স২৪ একটি সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের অন্তত ৪০টি অনিবন্ধিত মাদরাসায় জরিপ চালিয়েছিল।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, সেখানকার অন্তত ২৭ জন ধর্মীয় শিক্ষক সরাসরি শিশু যৌন নির্যাতনে জড়িত। অথচ স্থানীয় পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ এফআইআর পর্যন্ত নিতে অস্বীকার করে। সমাজের এই তথাকথিত আধ্যাত্মিক নেতাদের প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের সামনে দাঁড়িয়ে বিচারব্যবস্থা হঠাৎ করেই যেন অন্ধ ও বোবা সাজার ভান করতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
আমাদের সীমান্তের ওপারে, প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে তাকালে দেখা যায় কীভাবে এই ধরণের জঘন্য অপরাধীদের উল্টো পুরস্কৃত করতে হয়। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার কথা সবারই জানা। সেই সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় বিলকিস বানুকে নির্মমভাবে গণধর্ষণ করা হয়েছিল। ২০২২ সালে এসে গুজরাট রাজ্য সরকার হঠাৎ আবিষ্কার করল যে, আক্রমণকারীরা নাকি তাদের সাজা খেটে ফেলেছে!
ফলস্বরূপ, সরকার ১১ জন আসামিকে আগাম মুক্তি দিয়ে দিল। সহজ কথায় বলতে গেলে, সরকার যেন গণধর্ষকদের হাতে ‘সৎ চরিত্রের’ একটি ঝকঝকে সনদপত্র তুলে দিল। এই তামাশা বন্ধ করতে এবং অপরাধীদের পুনরায় জেলে পাঠাতে সুপ্রিম কোর্টের ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় লেগেছে। সুপ্রিম কোর্ট এই মুক্তিকে ‘ক্ষমতার নির্লজ্জ অপব্যবহার’ বলে বাতিল করে দেয়।
কিন্তু সেই প্রাথমিক মুক্তির ঘটনাটি আমাদের সামনে এক হাড়হিম করা বাস্তবতা প্রমাণ করে দিয়ে গেছে। দাঙ্গার সময় এই যৌন সহিংসতা কেবল কোনো বিশৃঙ্খলার আকস্মিক ফল ছিল না; এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হাতিয়ার। একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেরুদণ্ড ও সামাজিক মর্যাদা পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিতেই এই হাতিয়ারটি সুকৌশলে ব্যবহার করা হয়েছিল।
যখন সামরিক বাহিনী বা স্বয়ং রাষ্ট্র এই হাতিয়ার হাতে তুলে নেয়, তখন সেটি পুরোপুরি জাতিগত নিধনের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আমাদের খুব কাছের উদাহরণ হলো মিয়ানমার। জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তথ্যানুসন্ধান মিশন স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত করেছে যে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা নারীদের গণধর্ষণ করেছে। এটিকে তারা ব্যবহার করেছে জাতিগত নিধনের এক নিখুঁত সামরিক কৌশল বা অস্ত্র হিসেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দিকে চোখ ফেরালে চিত্রটা আরও ভয়াবহ। বর্তমান গাজা যুদ্ধে চলমান সংঘাতের সময়, ইসরায়েলি পুরুষ ও নারী সৈন্য, কারারক্ষী এবং এমনকি চিকিৎসা কর্মীরাও ফিলিস্তিনি নারী, শিশু এবং পুরুষদের ওপর বীভৎস যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা চালিয়েছে বলে অসংখ্য রিপোর্ট সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ভয়াবহ যৌন নির্যাতন এবং যৌনাঙ্গ বিকৃত করার মতো পাশবিক ঘটনা।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সরাসরি রিপোর্ট করেছেন যে, অন্তত দুজন ফিলিস্তিনি নারী ইসরায়েলি পুরুষ সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছেন। শুধু নারীরা নন, ফিলিস্তিনি কিশোর ও পুরুষরাও একইভাবে ধর্ষণ এবং ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধর্ষণ ও নির্যাতনের মাত্রা এতই অমানবিক ছিল যে, ভুক্তভোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে।
২০২৪ সালের জুনে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একটি ভয়ংকর উপসংহার টানা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, ৭ অক্টোবরের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক অপরাধের মাত্রা প্রমাণ করে যে, এই যৌন সহিংসতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর দৈনন্দিন অপারেশনাল কার্যপ্রণালীরই একটি নিয়মিত অংশ।
অন্যদিকে, জিনজিয়াং প্রদেশে একটি আস্ত জাতিকে মুছে ফেলার জন্য চীন কোনো অস্ত্রের আশ্রয় নেয়নি, তারা বেছে নিয়েছে নিরেট আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি। বিবিসি এবং এপি-র তদন্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, রাষ্ট্র কীভাবে উইঘুর মুসলিম নারীদের চীনা পুরুষদের শয্যাসঙ্গী হতে বাধ্য করছে—যার গালভরা নাম দেওয়া হয়েছে ‘আন্তঃজাতিগত বিবাহ।’
চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এই জবরদস্তিমূলক ধর্ষণ-প্রকল্পকে ‘সামাজিক সম্প্রীতি’ বলে নির্লজ্জের মতো বাজারজাত করছে। আড়ালে যা ঘটছে তা কোনো সম্প্রীতি নয়, বরং রাষ্ট্র-নির্দেশিত জনসংখ্যাগত পুনর্গঠন—সরকারি রিমোট কন্ট্রোলে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর সুপরিকল্পিত ও ধীরগতির বিলুপ্তি।
এবার আসুন আফগানিস্তানে, যেখানে ধর্ম ও নৈতিকতার বড়ি গিলিয়ে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো হয়। ২০২৫ সালের মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদন আফগানিস্তানে ‘বাচ্চা বাজি’ প্রথার যে বীভৎস চিত্র তুলে ধরেছে, তা তালেবানদের ধর্মীয় মুখোশ খোলার জন্য যথেষ্ট।
এই ‘বাচ্চা বাজি’ হলো স্রেফ প্রাতিষ্ঠানিক শিশু যৌন দাসত্ব। এখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের প্রাপ্তবয়স্কদের মনোরঞ্জনের জন্য নাইট ক্লাবের নর্তকদের মতো নাচানো হয় এবং শেষে তথাকথিত ‘ক্লায়েন্টদের’ বিছানায় যেতে বাধ্য করা হয়।
২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকে যারা ধর্মীয় নৈতিকতার বুলি আউড়ে গোটা বিশ্বের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে, তাদের নাকের ডগায় এই প্রথার রমরমা ব্যবসা একটি চরম সত্যকে নগ্ন করে দেয়: এই কঠোর ‘নৈতিকতা’ কেবল সাধারণ গরিব মানুষের গলায় পরানোর শেকল। আর এলিট বা ক্ষমতাবানরা? তারা সব নিয়ম ও আইনের ঊর্ধ্বে বসে এই বিকৃতির স্বাদ নিচ্ছে।
পাছে পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের খুব ধোয়া তুলসীপাতা মনে করে এবং আমাদের সবক দিতে আসে, সে জন্য জেফরি এপস্টিন এবং ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের শিশু পাচার চক্রটি স্মরণ করা জরুরি। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তথাকথিত সভ্য পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও অভিজাতদের সুরক্ষার জন্য দুর্ভেদ্য বর্ম রয়েছে।
প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম সরাসরি ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি এবং আইনি মীমাংসায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিল ক্লিনটন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো সাবেক প্রেসিডেন্টদের নাম পাওয়া গেছে এপস্টিনের প্রাইভেট জেটের ফ্লাইট লগে। এমনকি বিল গেটসের নামও মিলেছে গোপন শিডিউলিং রেকর্ডে।
ইন্টারনেট দুনিয়া যদিও ‘শয়তানের উপাসনা’ বা ‘আনুষ্ঠানিক শিশু বলিদান’-এর মতো আজগুবি গল্পে মেতে আছে, কিন্তু বাস্তব নথিভুক্ত সত্যটি এর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। আসল আতঙ্ক কোনো কার্টুনসুলভ শয়তানের কাল্ট ছিল না; এটি ছিল একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত, নিখুঁত আমলাতান্ত্রিক মানবপাচার চক্র।
এই চক্রে ক্ষমতাধর পুরুষদের বিরুদ্ধে তদন্ত আইনি জটিলতার অজুহাতে স্রেফ আইনের মারপ্যাঁচে বছরের পর বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছিল। এটিই হলো আধুনিক পশ্চিমা আইনের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য: অপরাধীর ব্যাংক ব্যালেন্স যত ভারী হবে, আইনের চাকা ঠিক ততটাই ধীরগতিতে ঘুরবে।
‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিশু পাচার’ বৈধ করার জন্য পাকিস্তানের বিচারপতি করিম খান আঘা এবং সৈয়দ হাসান আজহার রিজভীকে সরাসরি বরখাস্ত করার মেরুদণ্ড কি পাকিস্তানের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের আদৌ আছে? জাতিসংঘের তো অনেক তথ্যানুসন্ধান মিশন হলো, হাজার হাজার পৃষ্ঠার রিপোর্ট লেখা হলো, কিন্তু মিয়ানমারের জান্তা প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে হাজির করার নোটিশটি কোথায় আটকে আছে?
যখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলো কেবল পাঁচতারা হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অভিজাতদের সেমিনারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন আইন দুর্বলকে পিষে মারার একটি হাতিয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়। যে রাষ্ট্র বা যে বিশ্বব্যবস্থা তার সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাধর শিকারীদের জন্য আইনি বর্ম তৈরি করে দেয়, তাদের মুখে ‘শিশুর অধিকার’, ‘সার্বভৌমত্ব’ বা ‘মানবাধিকার’- শব্দগুলো বড্ড বেমানান।
নবোদয়/ এএ/ জেডআরসি/ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬