গ্যালারিতে থাকছে না লাল সবুজের উন্মাদনা
> বাঙালির কাছে ক্রিকেট শুধু খেলা হয়, আবেগ-ভালোবাসার আরেক নাম
> বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে জম্পেস উৎসব
> বাংলাদেশের জায়গায় খেলছে স্কটল্যান্ড
সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১০:২১:৪৬ এএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
ক্যালেন্ডারের পাতায় সালটা ২০২৬। ৭ ফেব্রুয়ারি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসর বসছে ভারতে, স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইটের আলো জ্বলবে, গ্যালারিতে দর্শকদের উল্লাসও থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কোথাও সেই চিরচেনা উন্মাদনা নেই।
চায়ের দোকানে তর্ক নেই, ছাত্রাবাসগুলোতে ব্যস্ততা নেই বড়পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন। কারণ, এবারের বিশ্বমঞ্চে নেই বাংলাদেশ। ক্রিকেট মহারণে বাঙালির এই অনুপস্থিতি এবারের বিশ্বকাপকে রঙহীন ও জৌলুসহীন করে তুলেছে।
বাঙালির কাছে ক্রিকেট শুধু খেলা হয়, আবেগ-ভালোবাসার আরেক নাম। দলমত নির্বিশেষে খেলার সময় সবাই এক হয়ে যায়। ১৯৯৯ সালে নর্দাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে যে রূপকথার জন্ম হয়েছিল, তা গত আড়াই দশকে ডালপালা মেলে মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
সেই থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে জম্পেস উৎসব। সাকিব, তামিম, মুশফিক বা মাশরাফি নামগুলো যেন কোটি বাঙালির হৃদস্পন্দনকে জাগিয়ে তোলে। কিন্তু ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এসে প্রাণের সেই স্পন্দন যেন থমকে গেছে।
সংকটের শুরু গত তেসরা জানুয়ারি, যখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) কোনো সুনির্দিষ্ট ক্রিকেটীয় কারণ ছাড়াই বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল দল থেকে বাদ দেয়।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের দেশের একজন সেরা ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানের নিরাপত্তা যেখানে নিশ্চিত করা যায়নি, সেখানে পুরো দল, সাংবাদিক ও দর্শকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? এই উদ্বেগ কোনো কল্পনার বিষয় নয়, বাস্তব।’
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ স্থানান্তরের দাবি জানালেও আইসিসি তা নাকচ করে দেয়। আইসিসি থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয় বাংলাদেশ যদি মুস্তাফিজকে বাদ দিয়ে দল সাজায় তবে নিরাপত্তার জন্য ভালো হয়।
এ ছাড়া বাংলদেশের পতাকা বা জার্সি পরে কাউকে স্টেডিয়ামে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু এত উদ্বেগ, শঙ্কা আর ভয় নিয়ে খেলতে যাওয়া কোন দলের পক্ষেই সম্ভব নয়। বাংলাদেশও পারেনি। ফলাফল বিশ্বকাপ বর্জন। এরপর বাংলাদেশকে ছাড়াই বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা করে আইসিসি।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না থাকায় সবচেয়ে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে গ্যালারিতে। বাংলাদেশি সমর্থকরা বিশ্বের সবচেয়ে আবেগপ্রবণ ফ্যানবেসগুলোর একটি। টাইগাররা জিতলে পুরো দেশ হাসে, মিছিলে রাজপথ প্রকম্পিত হয়। আবার হারলে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে অঝোরে নামে বিষাদের কান্না।
লাল সবুজের উড়ন্ত পতাকা বা বাঘের সাজে সজ্জিত শোয়েব আলীর গর্জন ছাড়া বিশ্বকাপ প্রাণহীন একটা খেলা মাত্র। এবারের আসরে অন্যান্য দেশের খেলা চলবে ঠিকই, কিন্তু সেই তীব্র আবেগ, সেই নখ কামড়ানো উত্তেজনা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়, সবই যেন রয়ে যাবে অনুপস্থিত।
বাংলাদেশ না থাকায় ক্ষতিটা শুধু বাংলাদেশের হয়, বড় ক্ষতি আইসিসিরও। বাণিজ্যিক দিক থেকে ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার বাংলাদেশ। গ্যালারি ভর্তি দর্শক আর অনলাইনে কোটি ভিউয়ারশিপের জোগান দেয় এই দেশের মানুষ। বাংলাদেশবিহীন বিশ্বকাপ মানেই স্পন্সরদের লোকসান, টিভি ভিউয়ারশিপের পতন এবং সোশ্যাল মিডিয়া এনগেজমেন্টে বিশাল ধস।
আইসিসি খুব ভালো করেই জানে, ভারত-পাকিস্তানের পর টুর্নামেন্টে ‘হাইপ’ তোলার জন্য বাংলাদেশি দর্শকদের বিকল্প নেই। ক্রিকেট মাঠে চার-ছক্কা হবে, নতুন চ্যাম্পিয়নও পাওয়া যাবে। কিন্তু লাল সবুজের জার্সি ছাড়া ২০২৬-এর বিশ্বকাপ যেন এক বিষাদগ্রস্ত উৎসব। লিটনের ব্যাটের তুলিতে আঁকা ক্রিকেটীয় শর্ট, মুস্তাফিজের কাটার, তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাট কিংবা তাসকিনের গতির ঝড় না থাকাটা এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে যে বিবর্ণ করে দিয়েছে, সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই অনুপস্থিতি আইসিসির জন্য বিশেষ বার্তা। বড় একটা জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে বিশ্ব আসর কখনই পূর্ণতা পায় না। রাজনৈতিক বা যেকোন সমস্যা খেলাধুলার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করুক এটা কেউ-ই চায় না।
দর্শকরা এখন শুধু অপেক্ষায়, কবে আবার গর্জন করে ফিরবে বাঘ, কবে আবার রঙিন হবে বিশ্বকাপের ক্যানভাস। আপাতত, টিভিপর্দায় খেলা চলবে, কিন্তু বাঙালির ড্রইংরুমে থাকবে বিষাদের ছায়া, পিনপতন নীরবতা।