ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কোনদিকে
সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিসিবির বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তার কাজের ধরনকে সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ ও নাজমুল হাসান পাপনের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০২:৫৭:২২ পিএম
শেয়ার করুন:
জুবায়ের রহমান চৌধুরী, ঢাকা
যেকোনো দেশের ক্রিকেটে প্রধান স্টেকহোল্ডার হচ্ছেন ক্রিকেটাররা। তাদের পরেই দর্শক। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ক্লাব সংগঠক, স্পন্সর, সাংবাদিক, আম্পায়ার ও প্রশাসকরা। এই বহুমাত্রিক কাঠামোর কেন্দ্রে থাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ফলে বোর্ডের নেতৃত্ব শুধু একটি প্রশাসনিক পদ নয়, বরং সমন্বয়, ভারসাম্য ও আস্থার প্রতীক।
কিন্তু সেই বিসিবির সঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার ক্রিকেটার, সংগঠক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্যাপক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আর সব কিছুর হোতা সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ নয়, মূলত আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গেই এই মতপাথর্ক্য তৈরি হয়েছে। আর এসব হচ্ছে তার দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই।
সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিসিবির বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তার কাজের ধরনকে সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদ ও নাজমুল হাসান পাপনের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন সম্মানিত ও জনপ্রিয়। কিন্তু সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই একাধিক সংকট তৈরি হয়েছে।
ঢাকার ক্লাবগুলোর লিগ বয়কট, জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বিপিএল বয়কটের আলটিমেটাম এবং সাংবাদিকদের দুই দফা বর্জন—এই ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে বোর্ড ও স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। সংকট সমাধানের পরিবর্তে সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে এক পরিচালকের মন্তব্য নিয়ে বিতর্কের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরে তাকে আগের পদে পুনর্বহাল করা ক্রিকেটারদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি করে। একইভাবে সাংবাদিকদের স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা ও কারণ দর্শানোর চিঠি ইস্যু বোর্ডকে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়েছে।
স্পন্সর আগ্রহেও ভাটা পড়েছে—এমন মন্তব্য শোনা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বা কাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখাও এখনো দৃশ্যমান নয়। ফলে নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সমন্বয় দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিসিবির সভাপতির এমন ন্যক্কারজনক আচরণ নিয়ে বিসিবির সাবেক পরিচালক সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর বলেন, ‘জেলা ও বিভাগের প্রকৃত সংগঠকদের সঙ্গে উনার সম্পর্ক নেই। ক্লাব সংগঠকদের সঙ্গে উনার সম্পর্ক নেই। সাংবাদিকদের বড় একটা অংশের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। ক্রিকেটারদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বর্তমান ক্রীড়া প্রশাসনের সঙ্গেও উনার বিরোধ।
ক্রীড়া প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তি বর্তমান ক্রীড়ামন্ত্রীকে বিসিবির সভাপতির একজন পরিচালক আসিফ আকবর একটি জাতীয় গণমাধ্যমে ন্যূনতম কোনো শিষ্টাচার সম্মানবোধ না রেখে মন্ত্রীকে ফাটাকেস্ট বলে মন্তব্য করার দৃষ্টতা দেখিয়েছেন।
বিসিবির সভাপতি হিসেবে উনি এর কোনো প্রতিবাদ করেননি। তার মানে উনি এটিকে সমর্থন করেন। তাহলে উনার সম্পর্ক থাকল কার সঙ্গে। এভাবে হলে উনি কিভাবে বোর্ড চালাবেন। উনি কেন এখানে আসছেন? আসলে উনি খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর বিসিবিতে আসার আগ পর্যন্ত সারা জীবন করেছেন চাকরি।
আইসিসির একটি চতুর্থ স্তরে গেম ডেভেলপমেন্ট কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ছাড়ার পর দেশের ক্রিকেটে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যোগাযোগ নেই। কারও সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তার পক্ষে কী দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পদে বসে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। সে যোগ্যতা উনার আছে? যে কারণে তিনি এভাবে একটির পর একটি সমস্যা তৈরি করে যাচ্ছেন আর দেশের ক্রিকেটের ক্ষতি করে যাচ্ছেন।’
ফারুক আহমেদ: সীমিত মেয়াদ, কম সংঘাত
ফারুক আহমেদ-এর সময়কাল ছিল তুলনামূলকভাবে স্বল্প ও সীমিত প্রভাবের। তার নেতৃত্বে বড় ধরনের বয়কট বা প্রকাশ্য সংঘাত দেখা যায়নি। তিনি ক্রিকেট পরিচালনায় শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি।
বোর্ডের ভেতরে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও তা প্রকাশ্য অস্থিরতায় রূপ নেয়নি। আর্থিক কাঠামো স্থিতিশীল ছিল, তবে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। জাতীয় দলের পারফরম্যান্সও ছিল ওঠানামার মধ্যে। ফারুক আহমেদের সময়কে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার সময়কাল হিসেবে দেখা যায়—কম বিতর্কিত, কিন্তু রূপান্তরমূলকও নয়। যদিও তার বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগও আছে।
নাজমুল হাসান পাপন: শক্ত নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোগত উন্নয়ন
নাজমুল হাসান পাপন দীর্ঘ সময় বিসিবির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার প্রশাসনিক ধরন ছিল কেন্দ্রীভূত ও দৃঢ় সিদ্ধান্তনির্ভর। সমালোচনা থাকলেও নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। তার আমলে বিসিবি আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়। বিপিএল ব্র্যান্ডের সম্প্রসারণ, স্পন্সর ও সম্প্রচার চুক্তির বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয় এবং জাতীয় দলের ধারাবাহিক উন্নতি তার সময়েই আসে।
ক্রিকেটারদের সঙ্গে মতবিরোধ বা মিডিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা থাকলেও বড় আকারের স্থায়ী ভাঙন তৈরি হয়নি। তবে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে সমালোচনা ছিল।
ক্রিকেট বোর্ড পরিচালনা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা, সংকট সামাল দেওয়া এবং বিভিন্ন স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সমন্বিত প্রক্রিয়া। জনপ্রিয়তা বা খেলোয়াড়ি সাফল্য নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা, নেটওয়ার্ক, অভিজ্ঞতা ও সমঝোতার মানসিকতা।
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বিসিবি একটি নেতৃত্ব-সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্টেকহোল্ডারদের আস্থা পুনর্গঠন এবং সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। নইলে মাঠের খেলার বাইরের সংকটই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নবোদয়/ জেডআরসি/ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬