গৃহকর্মীর হাতে মা-মেয়ে হত্যা
মামলার তদন্ত সূত্রে জানা যায়, নিছক চুরির উদ্দেশ্যেই গৃহকর্মী সেজে বাসা-বাড়িতে কাজ নিতেন আয়েশা। চুরিই তার পেশা। চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ায় পর্যায়ক্রমে মা ও মেয়েকে হত্যা করেন তিনি।
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০৭:১৩:০০ পিএম
শেয়ার করুন:

মাহমুদুল হাসান, ঢাকা
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গৃহকর্মীর চুরি ছকে বাধা হওয়ায় নিজ ফ্ল্যাটে মা ও মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডর শিকার হতে হয়েছিল। এই ঘটনা দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও মাত্র দেড় মাসের মাথায় সেটি চাপা পড়ে গেছে নিত্য নতুন ঘটনার ভিড়ে।
কিন্তু রাজধানীতে গৃহকর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জনসচেতনতা এবং আইনী সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। সেই ঘটনারই বা বিচার কতদূর হলো তার খেয়াল রেখেছেন?
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) আলোচিত এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য আদালতের দিন ধার্য রয়েছে। এর আগে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় একবার সময় পিছিয়েছিল আদালত।
মামলার তদন্ত সূত্রে জানা যায়, নিছক চুরির উদ্দেশ্যেই গৃহকর্মী সেজে বাসা-বাড়িতে কাজ নিতেন আয়েশা। চুরিই তার পেশা। চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ায় পর্যায়ক্রমে মা ও মেয়েকে হত্যা করেন তিনি।
কী ঘটেছিল সেদিন?
গত ৮ ডিসেম্বর ২০২৫, মোহাম্মদপুরের একটি ফ্ল্যাটে খুন হন লায়লা আফরোজ এবং তার কলেজপড়ুয়া মেয়ে নাফিসা। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনার দিন সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে আয়েশা বাসায় ঢোকেন।
বাসা থেকে ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা চুরির সময় গৃহকর্ত্রী লায়লা দেখে ফেলায় তাকে বটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে নাফিসা এগিয়ে এলে তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করেন আয়েশা।
হত্যাকাণ্ড ও লুটপাট শেষে সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে তিনি স্কুল ড্রেস পরে ছদ্মবেশে বের হয়ে যান। পুলিশ জানায়, অপরাধী ধরা না পড়ার জন্য স্কুল ড্রেস পরার এই অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার মাত্র ৩ দিন আগেই অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর আয়েশাকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। নিয়োগের সময় তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, ছবি বা জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করেননি আ জ ম আজিজুল ইসলাম ও লায়লা আফরোজ দম্পতি।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন উত্তরার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আ জ ম আজিজুল ইসলাম কর্মস্থলে চলে গেলে বাসায় একা থাকেন তার স্ত্রী লায়লা ও মেয়ে নাফিসা। প্রতিদিনের মতো কাজের জন্য আসেন কৃহকর্মী আয়েশা।
কর্মস্থল থেকে তিনি স্ত্রীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে তিনি বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে বাসায় আসেন। এসে দেখেন তাঁর স্ত্রীর গলাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা, রক্তাক্ত জখম। তিনি মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন।
আর তাঁর মেয়ের গলার ডান দিকে কাটা, সে গুরুতর আহত অবস্থায় বাসার মূল দরজার কাছাকাছি পড়ে ছিল। মেয়েকে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
যেভাবে আটক হন ঘাতক আয়েশা ও তার সহযোগী
হত্যাকাণ্ডের পর সিসিটিভি ফুটেজে বোরখা ও মাস্ক পরা অবস্থায় এক নারীকে বের হতে দেখা যায়, যার মুখ স্পষ্ট ছিল না। তবে সিসিটিভি থেকে সেই নারীর গলায় একটি পোড়া দাগ অনুমান করতে পারে পুলিশ। সেটির সূত্র ধরে মোহাম্মদপুর থানার পুরোনো অপরাধীদের তালিকা ও ছবি যাচাই করতে গেলে সামনে আসে আয়েশার অপরাধের ফিরিস্তি।
তদন্তে জানা যায়, আয়েশা একজন পেশাদার চোর এবং এর আগেও চুরির দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার গলায় একটি পুরনো পোড়া দাগ ছিল, যা পুলিশের সংরক্ষিত নথিতে উল্লেখ ছিল। সিসিটিভি ফুটেজের শারীরিক গঠন এবং ওই পোড়া দাগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, হত্যাকারী ওই নারীই আয়েশা।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের সহায়তা নেয়। তদন্তে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর আয়েশা বাসা থেকে স্কুল ড্রেস পরে বের হয়ে প্রথমে শ্যামলী ও পরে গাবতলীর দিকে যান। সেখানে তার স্বামী রাব্বি শিকদারের সঙ্গে মিলিত হন।
এরপর তারা নিজেদের অবস্থান গোপন করতে ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করেন এবং একপর্যায়ে ঢাকা ছেড়ে লঞ্চযোগে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে পালিয়ে যান। প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, তারা বরিশালের ঝালকাঠি জেলায় অবস্থান করছেন।
আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের একটি যৌথ দল ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ গভীর রাতে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার কয়ারচর গ্রামে অভিযান চালায় পুলিশ। এটি ছিল আয়েশার স্বামী রাব্বি সিকদারের গ্রামের বাড়ি।
বিয়ের পর এই প্রথম আয়েশা তার শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন। পুলিশ অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ওই বাড়ি ঘেরাও করে এবং ঘুমের মধ্যেই মূল হত্যাকারী আয়েশা ও তার সহযোগী স্বামী রাব্বি শিকদারকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
পুলিশ তাদের কাছ থেকে লুট হওয়া স্বর্ণালংকার, ল্যাপটপ ও নগদ টাকার আংশিক উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে কাজ করবে। গ্রেপ্তারের পর পৃথকভাবে তাদের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়।
গত ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আয়েশা। তিনি আদালতকে জানান, চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ায় মা ও মেয়েকে হত্যা করেন তিনি। তার আগে আয়েশার স্বামী রাব্বি সিকদার চুরির পরিকল্পনা ও পালাতে সহায়তার অভিযোগে ১৫ ডিসেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তি দেন।
মামলার অগ্রগতি কতদূর
এই জোড়া খুনের ঘটনায় ৮ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় মামলা দায়ের করেন নিহত লায়লা আফরোজের স্বামী এবং নিহত নাফিসার বাবা আ জ ম আজিজুল ইসলাম। দণ্ডবিধির ৩০২ এবং ৩৯৪ ধারায় মামলাটি তদন্ত ভার পড়ে মোহাম্মদপুর থানার এসআই সহিদুল ওসমান মাসুমের কাঁধে।
ঘটনার আলামত, প্রমাণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের স্বাীকারোক্তি থাকার পরও এই ঘটনায় এখনো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়েনি। আদালত সূত্রে জানা যায়, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এখন পর্যন্ত একবার পিছিয়েছে। গত ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রতিবেদন দাখিলের কথা থাকলেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় আদালত সময় বাড়িয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নতুন দিন ধার্য করেন।
মামলার বাদী আ জ ম আজিজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার সাজানো সংসার মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সামান্য কিছু টাকার জন্য আমার স্ত্রী ও মেয়েকে এভাবে হত্যা করা হবে, তা ভাবতেও পারি না। আমি প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, চার্জশিট দ্রুত দিয়ে ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হোক।”
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, মোহাম্মদপুর থানার এসআই সহিদুল ওসমান মাসুম বলেন, ‘আসামি আয়েশা একজন পেশাদার চোর। এর আগেও তিনি বিভিন্ন বাসায় কাজ নেওয়ার নাম করে চুরি করেছেন। আমরা পর্যাপ্ত আলামত ও লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করেছি। আসামিরা স্বেচ্ছায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে আমরা আশাবাদী। আমরা চাই দ্রুততম সময়ে বিচার শুরু হোক।’
নবোদয়/ এমএইচ/ জেডআরসি/ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬