একের পর এক বীভৎস ধর্ষণ ও হত্যা
আছিয়া, তনু, নুসরাত থেকে শুরু করে পাবনার জামিলা বা নরসিংদীর কিশোরী—এই নামের তালিকা যেন আর দীর্ঘ না হয়। শুধু মোমবাতি জ্বালিয়ে বা স্লোগান দিয়ে এই মহামারি থামানো যাবে না। রাষ্ট্রকে তার সদিচ্ছা দেখাতে হবে।
রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬ । ০২:৪০:৩৮ পিএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
দুই দিনের ব্যবধানে দেশের দুই প্রান্তে ঘটে যাওয়া দুটি পৈশাচিক ঘটনা আবার প্রমাণ করে দিল ‘এই সমাজে নারী ও শিশু নিজ বাড়িতেও নিরাপদ না’। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) নরসিংদীর মাধবদীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো অপহৃত ও খুনের ঘটনার পর শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) পাবনার ঈশ্বরদীতে দাদিকে কুপিয়ে হত্যার পর নাতনিকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা, পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
একের পর এক এমন যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক গভীর অন্ধকার দিক উন্মোচিত করছে। প্রশ্ন জাগে, ধর্ষণ কেন এত ভয়াবহ হারে বাড়ছে? এই পাশবিকতার শেষ কোথায়?
নরসিংদীর মাধবদীতে এক পোশাকশ্রমিক কিশোরী ১৫ দিন আগে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। তার বাবা বিচার চেয়ে থানায় যেতে চাইলে অভিযুক্তরা প্রাণনাশের হুমকি দেয় এবং মাঝপথে আটকে দেয়।
নিরুপায় পরিবার স্থানীয় এক প্রভাবশালীর (সাবেক মেম্বার) কাছে বিচার চাইলে, উল্টো অভিযুক্তদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে তাদের গ্রাম ছাড়ার চাপ দেওয়া হয়। গ্রাম ছাড়ার পথে পুনরায় অভিযুক্তরা কিশোরীকে অপহরণ করে এবং পরে সরিষা ক্ষেতে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে পাবনার ঈশ্বরদীর ভবানিপুর গ্রামে মধ্যরাতে ঘটে যাওয়া জোড়া খুনের ঘটনাটি যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকে শিহরিত করবে। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকা বাবার অবর্তমানে ১৫ বছরের কিশোরী নাতনি তার ৬৫ বছরের দাদির সঙ্গে বসবাস করত।
দুর্বৃত্তরা মধ্যরাতে সেই কিশোরীকে তুলে নিতে চাইলে দাদি বাধা দেন। ক্ষিপ্ত হয়ে তারা বৃদ্ধা দাদিকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে এবং পরে নাতনিকে পাশের সরিষা ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
এই দুটি ঘটনা স্পষ্টভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ধর্ষকরা এই সমাজ ও রাষ্ট্রে কতটা বেপরোয়া। তারা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বাধা দিলে বা বিচার চাইলে অনায়াসে খুনও করছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুসারে, ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে, বাংলাদেশে কমপক্ষে ১১ হাজার ৭৫৮ জন নারী ও মেয়ে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৩০৫ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
আরও আশঙ্কার বিষয় হলো, যাদের ধর্ষণ করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৪৭১ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে, যা মোট ঘটনার ৫৫ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৯ জন নারী ও কন্যাশিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ২০৭ জনকে যৌন সহিংসতার পর হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১৮ জনই শিশু।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৪২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৭টি, মার্চে ১৩২টি, এপ্রিলে ৯৩টি, মে মাসে ৫৯টি, জুনে ৬৩টি, জুলাইয়ে ৫৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ, ৭ মাসে দেশে মোট ৫০২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর পরের পরিসংখ্যান এখনও হাতে না আসলেও অবস্থা যে শোচনীয় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ধর্ষণ কেন বাড়ছে? কারণ ও মনস্তত্ত্ব
ধর্ষণ কেবল একটি শারীরিক নির্যাতন নয়, এটি এক বিরাট মানসিক বিকারগ্রস্ততা। এই বিকারগ্রস্ততার জন্ম হঠাৎ করে হয় না; এর পেছনে রয়েছে আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র কাঠামোর গভীর দায়।
সুস্থ যৌন শিক্ষার অভাব ও বিকৃত মানসিকতা
আমাদের একাডেমিক শিক্ষাব্যবস্থায় যৌনশিক্ষা বা বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা নেই। ফলে উন্মুক্ত প্রযুক্তির যুগে তরুণ প্রজন্ম ভুলভাল ও বিকৃত যৌন বিনোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সুস্থ যৌন শিক্ষার অভাবে প্রজন্মের মাঝে বিকৃত যৌন বাসনা ও অবদমন তৈরি হচ্ছে, যা থেকে ধর্ষণের মতো পাশবিক মানসিকতা জন্ম নেয়।
নারীর প্রতি সম্মানহীনতা ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি
পরিবার বা সমাজ কোথাও একজন পুরুষকে নারীকে সম্মান করতে শেখানো হয় না। নারী যখন তার অধিকার বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছে, তখন পুরুষদের একাংশ তা মেনে নিতে পারছে না। তারা নারীকে স্বাধীন মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল 'ভোগ্যপণ্য' হিসেবে বিবেচনা করে। নারীর প্রতি এই সম্মানহীনতাই পুরুষকে ধর্ষক করে তোলে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের ফাঁকফোকর
ধর্ষকরা জানে যে, এই রাষ্ট্রে আইনি প্রক্রিয়ায় অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। তারা জানে, প্রভাবশালীদের টাকা খাইয়ে বা ভয় দেখিয়ে পার পাওয়া যায়। আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় ধর্ষকরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি করতে দ্বিধা করে না।
ভিক্টিম ব্লেমিং বা ধর্ষিতাকেই দোষারোপ করা
আমাদের সমাজের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, ধর্ষণের শিকার হলে নারীর পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ধর্ষকের চেয়ে ধর্ষিতার উপরেই সব দোষ চাপানোর চেষ্টা চলে। সমাজ তাকে 'অস্পৃশ্য' করে রাখে, আর ধর্ষক পার পেয়ে যায়। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ধর্ষকদের পরোক্ষভাবে উৎসাহ যোগায়।
দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা
আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। ফেনীর নুসরাত হত্যার পর আইন হলেও, অনেক ধর্ষক রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আনুকূল্যে পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নরসিংদী ও পাবনার ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে ফাঁসিতে ঝোলাতে হবে, যাতে অন্যরা ভয় পায়।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও সুস্থ যৌন শিক্ষা চালু করা
নারীদের পোশাক বা চলাফেরাকে দোষারোপ করা বন্ধ করতে হবে। ভিক্টিম ব্লেমিং সমাজের একটি ক্যানসার। এর পাশাপাশি, পাঠ্যপুস্তকে বয়সোপযোগী ও সুস্থ যৌন শিক্ষা এবং নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাঠ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব
পরিবারের ভেতরে পুরুষ সদস্যদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শেখে। একটি সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে পুরুষদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বিকৃত ধর্ষকাম মানসিকতা দূর করতে হলে পরিবার থেকেই মানবিক মূল্যবোধের বীজ বপন করতে হবে।
স্থানীয় প্রভাবশালীদের জবাবদিহি
নরসিংদীর ঘটনার মতো যারা সালিশের নামে ধর্ষকদের বাঁচিয়ে দেয়, সেসব স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালীদেরও সমান অপরাধী হিসেবে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ না হলে ধর্ষণ কমানো সম্ভব নয়।
আছিয়া, তনু, নুসরাত থেকে শুরু করে পাবনার জামিলা বা নরসিংদীর কিশোরী—এই নামের তালিকা যেন আর দীর্ঘ না হয়। শুধু মোমবাতি জ্বালিয়ে বা স্লোগান দিয়ে এই মহামারি থামানো যাবে না। রাষ্ট্রকে তার সদিচ্ছা দেখাতে হবে।
ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে, যেখানে একজন পুরুষ মানবিক হয়ে উঠবে এবং নারী ভয়হীনভাবে বাঁচতে পারবে। তা না হলে, এই জনপদ নারীদের জন্য চিরকাল এক নরক হয়েই থাকবে।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০১ মার্চ ২০২৬