মা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে
স্বাস্থ্য অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় কলেরাসহ সংক্রামক রোগের অনিয়ন্ত্রিত প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালে আরও গভীর সংকট আসতে পারে, কারণ বিদ্যমান চুক্তিগুলো একে একে শেষ হচ্ছে এবং নতুন অর্থায়নের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১১:০৬:৫৭ এএম
শেয়ার করুন:

রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। আদেশে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মার্কিন সাহায্য সংস্থা USAID-এর সমস্ত কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত।
কারণ হিসেবে প্রশাসন জানায়, বিদেশি সাহায্য মার্কিন জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এই অর্থ দেশের অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যয় হওয়া উচিত। কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে একযোগে অনুদান বন্ধ হয়ে যায়।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ USAID থেকে মোট ৩৭১ মিলিয়ন ডলার পেয়েছিল। ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ১৬৪ মিলিয়ন ডলারে। তবে স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতি সবচেয়ে তীব্র। IHME-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অনুদান ৮০ মিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এসেছে মাত্র ২ মিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ হ্রাস, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ।
সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি খাত। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে icddr,b পরিচালিত স্ক্রিনিং কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গেছে, যা ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষকে পরীক্ষা করেছিল এবং দেড় লাখের বেশি রোগী শনাক্ত করেছিল। শিশু টিকাদানে ডিফথেরিয়া, হাম, পোলিও ও টিটেনাস প্রতিরোধী কার্যক্রম থেকে ২৩ লাখ শিশু বাদ পড়ার ঝুঁকিতে।
আট জেলায় ১৬ লাখ পরিবারকে সেবাদানকারী মা ও প্রজনন স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলো স্থগিত হয়েছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে শিশু সুরক্ষা, পুষ্টি ও চিকিৎসা সরবরাহে কমপক্ষে ১৫ মিলিয়ন ডলার কাটছাঁট হয়েছে এবং আরও ১০০ মিলিয়ন ডলারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। icddr,b-তে এক হাজারের বেশি গবেষক ও কর্মী ছাঁটাই হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে প্রায় ৫০,০০০ কর্মী রাতারাতি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
এমতাবস্থায় তাৎক্ষণিক প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। যক্ষ্মা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা রোগটির পুনরুত্থানের আশঙ্কা করছেন, বিশেষত ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার ক্ষেত্রে। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এনজিও-পরিচালিত প্রসূতি ক্লিনিকগুলো বন্ধ হওয়ায় মা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে বলে UNFPA জানিয়েছে।
কক্সবাজারে WHO সতর্ক করেছে, স্বাস্থ্য অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় কলেরাসহ সংক্রামক রোগের অনিয়ন্ত্রিত প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালে আরও গভীর সংকট আসতে পারে, কারণ বিদ্যমান চুক্তিগুলো একে একে শেষ হচ্ছে এবং নতুন অর্থায়নের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি আরও গুরুতর। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও গবেষণা সক্ষমতা বিনষ্ট হচ্ছে। icddr,b-র যক্ষ্মা প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ডা. নাজমুল হুদা বলেছেন, প্রযুক্তি হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে প্রকল্প হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় গত কয়েক বছরের অর্জন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির মাত্র আড়াই শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ আসে ব্যক্তির নিজ পকেট থেকে। বরাদ্দ থাকলেও সেটা সম্পূর্ণ খরচ হয় না, প্রতি বছর উন্নয়ন বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাবে অব্যয়িত থাকে। চিকিৎসা সরঞ্জামের ৯৯ শতাংশ আমদানিনির্ভর, যা ডলার সংকটের প্রেক্ষাপটে আরেকটি চাপ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার কূটনৈতিক বিকল্প খুঁজছে এবং আগস্ট ২০২৫-এ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন আয়োজন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার স্বাস্থ্য খাতের এই কাঠামোগত সংকট মোকাবেলায় কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো ঘোষণা করেনি।
নতুন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় স্বাস্থ্য সংস্কার কতটা উপরে থাকবে, তা সময়ই বলবে। তবে বাস্তবতা হলো, দশকের পর দশক ধরে বিদেশি অনুদানের উপর গড়ে ওঠা স্বাস্থ্য কাঠামোর ভঙ্গুরতা এই সংকট সামনে এনেছে এবং এই সমস্যা কোনো একটি দলের তৈরি নয়। ফলে সমাধানও কোনো একটি সরকারের পক্ষে একা করা সম্ভব নয় এমনটিই ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬