হলমার্ক কেলেঙ্কারি
নামসর্বস্ব হলমার্ক গ্রুপের নামে সেই জালিয়াতির পরিমাণও দিনে দিনে ফুলে ফেঁপে দাঁড়ায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর সেই মামলার প্রধান অভিযুক্ত তানভীর মাহমুদ, যিনি দীর্ঘ কারাজীবন ভোগ করছিলেন, জেলবন্দি অবস্থায় গেল ২৯ নভেম্বর রাতে মারা গেলেন, রেখে গেলেন অসংখ্য প্রশ্ন—যার উত্তর আজও পুরোপুরি মেলেনি।
সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০২:২৯:৩৩ পিএম
শেয়ার করুন:

রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা
ঢাকার পরীবাগে ব্যস্ততম সড়কের কোলঘেঁষে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ তারকা হোটেল। ফুটপাত মাড়িয়ে কিংবা সড়কপথে প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত এখান দিয়েই। কেউ কি জানতো— সেই পাঁচ তারকা হোটেল ভবনে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের ওই শাখায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির বীজ রোপিত হচ্ছে।
নামসর্বস্ব হলমার্ক গ্রুপের নামে সেই জালিয়াতির পরিমাণও দিনে দিনে ফুলে ফেঁপে দাঁড়ায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর সেই মামলার প্রধান অভিযুক্ত তানভীর মাহমুদ, যিনি দীর্ঘ কারাজীবন ভোগ করছিলেন, জেলবন্দি অবস্থায় গেল ২৯ নভেম্বর রাতে মারা গেলেন, রেখে গেলেন অসংখ্য প্রশ্ন—যার উত্তর আজও পুরোপুরি মেলেনি।
২০১০ থেকে ২০১২—মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার (বর্তমানে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) একটি ক্ষুদ্র অফিসরুম যেন পরিণত হয় দেশের সবচেয়ে আলোচিত ‘ফ্যাক্টরি অব ফেক ডকুমেন্টস’-এ।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেদ করে, কাগজে-কলমে তৈরি হয়ে চলে ভুয়া এলসি, অদৃশ্য কোম্পানি, অসত্য আমদানির কাগজ। সেসব নথি যাচাই না করেই অনুমোদিত হয় একের পর এক ঋণ। ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের কক্ষ থেকে জেনারেল ম্যানেজারের স্বাক্ষর—সবই যেন অদ্ভুত এক দ্রুতগতির ট্রান্সফার মেশিনে পরিণত হয়, যেখান থেকে কোটি কোটি টাকার সরকারি তহবিল বেরিয়ে যায় একদল ব্যবসায়ীর হাতে।
এই সময়টায় হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ হয়ে ওঠেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তার নেতৃত্বে কোম্পানিটি ভুয়া নথির সহায়তায় রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের তহবিল থেকে যে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তা প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০১২ সালে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে জালিয়াতির পরিমাণ চিহ্নিত করার পর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শুরু হয় আলোড়ন। আর্থিক খাতে আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়, দেশের ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন ওঠে।
তদন্ত শুরু হলে বেরিয়ে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য। বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নাম, একই ঠিকানা থেকে একাধিক কোম্পানির নথি, এমনকি কিছু ঋণ নেওয়া হয়েছে কাগজে অস্তিত্ব না থাকা আমদানি-রপ্তানির কাহিনী সাজিয়ে।
সোনালী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তাও এই জালিয়াতিতে যুক্ত ছিলেন—কেউ ঘুষ নিয়েছেন, কেউ দায়িত্বে অবহেলা করেছেন, কেউ আবার অনুমতি দিয়েছেন নিয়মবহির্ভূত লেনদেনে। পরবর্তীতে এদের বেশ কয়েকজনের নামও মামলায় উঠে আসে।
২০১২ সালের শেষ দিকে দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করে। ওই সময় গ্রেপ্তার হন তানভীর মাহমুদ ও তার স্ত্রী জেসমিন ইসলাম। গ্রেপ্তারের পর থেকেই আদালত চত্বরে শুরু হয় আরেক অধ্যায়—অপরাধের বিচার।
কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া কখনো এগিয়েছে, কখনো থেমে গেছে; কখনো সাক্ষ্য হয়নি, কখনো মামলার শুনানি পিছিয়েছে। এক পর্যায়ে এত মামলা, এত ধারা, এত কাগজ যে, ঘটনাটি যেন আইনি জটিলতার এক গোলকধাঁধায় আটকে পড়ে।
সময় পেরিয়ে যায়। অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে জায়গা করে নেয় ‘হলমার্ক ইফেক্ট’—একটি কেস স্টাডি হিসেবে। সরকারি ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, আর্থিক নীতির শিথিলতা এবং দায়বদ্ধতার অভাবকে সামনে রেখে আলোচনায় উঠে আসে একের পর এক সংস্কারের পরামর্শ। যদিও ব্যাংকিং খাতে কিছু পরিবর্তনও হয়, তবুও সেই বিশাল অঙ্কের ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি আজও।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্যে ২০২৪ সালে বিশেষ আদালত হলমার্ক মামলার একটির রায় ঘোষণা করে। সেখানে তানভীর মাহমুদ ও তার স্ত্রীসহ কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তখনও অনেকগুলো মামলা চলমান রয়েছে।
হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় প্রতিষ্ঠানটির হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তানভীর মাহমুদসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার জন্য আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।
তানভীর ছিলেন দেশের সবচেয়ে আলোচিত বরখাস্ত-বন্দি শিল্প উদ্যোক্তাদের একজন। জেলে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনাও হয়েছে। অবশেষে আসে, ২৯ নভেম্বরের রাত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সংবাদ আসে তানভীরের।
মৃত্যু ব্যক্তিজীবনে চূড়ান্ত পরিণতি হলেও শেষ হলো না হলমার্ক কেলেঙ্কারির সেই কলঙ্কিত অধ্যায়; বরং শেষ হলো কেবল এক চরিত্রের যাত্রা। রেখে গেল অসংখ্য প্রশ্নের অমীমাংসিত উত্তর!
হলমার্কের নামে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে যে টাকা বেরিয়ে গিয়েছিল, তার পুরোটা উদ্ধারও হয়নি আজও। এখনও চলমান আছে মামলার কয়েকটি ধাপ। এখনও রয়ে গেছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও তদারকির শূন্যতা নিয়ে বহু প্রশ্ন।
হলমার্ক কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে শুধু নাড়া দেয়নি, প্রকাশ করেছে এক গভীর বাস্তবতা। একটি দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলে, কাগজে লেখা একটি মিথ্যাই কোটি কোটি টাকার ক্ষতির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
তানভীর মাহমুদের মৃত্যু সেই ইতিহাসকে আরও একবার সামনে নিয়ে আসে। কারণ জেলখানার হাসপাতালের শেষ বিছানায় শুয়ে থাকা একজন ব্যক্তির মৃত্যু কোনোভাবেই তিন হাজার কোটি টাকার ক্ষতি, বহু বছরের বিচার, আর একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশ্বাস হারানোর গল্পকে শেষ করে দিতে পারে না।
হলমার্ক কেলেঙ্কারির বিচার যেমন অপূর্ণ রয়ে গেল, তেমনি রয়ে গেল শেখার জায়গাগুলোও—যে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিংয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ছাড়া ভবিষ্যতের আর কোনো সংকটই দূরে নয়।