বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৬:৩৯ এএম
শেয়ার করুন:

নিজস্ব প্রতিবেদক
বড় দুর্নীতি বা স্ক্যাম মানেই শুধু কিছু ব্যক্তির অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন নয়; এটি একটি সমান্তরাল অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেহাত হয় সম্পদ, কিন্তু তার বোঝা বহন করে সাধারণ মানুষ।
ব্যাংকিং খাত, শেয়ারবাজার, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম— যেখানেই বড় অঙ্কের দুর্নীতি হয়েছে, সেখানেই দেখা গেছে একই চিত্র: কিছু মানুষ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে, আর সেই টাকার ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সংঘটিত বড় কেলেঙ্কারিগুলো এই বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে যায় জাল কাগজ আর ভুয়া এলসির মাধ্যমে। একইভাবে বেসিক ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অস্তিত্বহীন বা অযোগ্য প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়, যার সিংহভাগই ফেরত আসেনি।
এই টাকা কোনো পাহাড়ে চাপা পড়ে থাকেনি; এটি চলে গেছে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী ও গোষ্ঠীর হাতে। কিন্তু এর ফল ভোগ করেছে পুরো দেশ, কারণ এই ক্ষতি সামাল দিতে সরকারকে বারবার জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে ওই ব্যাংকটিকে নতুন পুঁজি জোগাতে হয়েছে। অর্থাৎ একজন শ্রমজীবী মানুষ যে কর দিচ্ছেন, তার একটি অংশ সরাসরি যাচ্ছে সেই দুর্নীতির ক্ষত ঢাকতে।
এই ধরনের ব্যাংক কেলেঙ্কারির সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। যখন ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়ে যায়, তখন ব্যাংক ঝুঁকি নিতে চায় না। নতুন উদ্যোক্তা ঋণ পান না, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে না, কৃষক সহজ শর্তে টাকা না পেয়ে মহাজনের কাছে যান। অর্থনীতিতে তখন টাকার প্রবাহ কমে যায়, কর্মসংস্থান তৈরি হয় না, বাজারে স্থবিরতা আসে। কাগজে-কলমে এই ক্ষতিকে “নন-পারফর্মিং লোন” বলা হলেও বাস্তবে এটি মানুষের জীবনের গতি কমিয়ে দেয়।
শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির প্রভাব বিনিয়োগকারীর ব্যক্তিজীবনকে এলোমেলো করে দেয়। ২০১০–১১ সালের শেয়ারবাজার ধসে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাত থেকে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে স্থানান্তরিত হয়। যারা বাজার কারসাজিতে লাভবান হয়েছে, তারা হয়তো নতুন খাতে বিনিয়োগ করেছে বা টাকা বিদেশে পাঠিয়েছে। কিন্তু যে পরিবারটি জীবনের সঞ্চয় ঢেলেছিল শেয়ারে, তারা হঠাৎ করেই ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
এই ধাক্কার ফল শুধু সেই সময়ের ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর ফলে একটি পুরো প্রজন্ম শেয়ারবাজারকে ভয় পেতে শিখেছে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থ দাঁড়ায়—বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দুর্বল থাকে, শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পথ সংকুচিত হয়, আর অর্থনীতি আরও বেশি ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়ে।
এমএলএম ও সমবায়ভিত্তিক স্ক্যামগুলো অর্থনীতির আরেকটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। ডেসটিনি বা যুবক-কৃষক সমবায়ের মতো ঘটনায় হাজার হাজার কোটি টাকা নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। এখানে কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে, আবার কেউ মেয়ের বিয়ের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন।
এই অর্থ হারিয়ে তারা শুধু আর্থিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল হলো—মানুষ বৈধ আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায় এবং অনানুষ্ঠানিক, ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ডিজিটাল যুগে ই-কমার্স কেলেঙ্কারিগুলোও সেই একই পুরোনো কাঠামোর-ই আধুনিক রূপ। ইভ্যালি বা ই-অরেঞ্জের মতো ঘটনায় শত শত কোটি টাকা আটকে গেছে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ থেকে। এখানে ব্যাংক ঋণ বা শেয়ারবাজারের মতো জটিল হিসাব নেই; এখানে ক্ষতিটা সরাসরি সংসারের বাজেটে আঘাত করেছে।
মাসের কেনাকাটার টাকা, সন্তানের পড়াশোনার জন্য জমানো অর্থ, কিংবা বিয়ের জন্য রাখা সঞ্চয়—সবই এক ক্লিকে চলে গেছে। এর ফলে শুধু ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হননি, বরং পুরো ডিজিটাল অর্থনীতি আস্থার সংকটে পড়েছে, যা ভবিষ্যতের বৈধ অনলাইন ব্যবসার পথও কঠিন করে তোলে।
এই সব স্ক্যাম বা কেলেঙ্কারি একত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বড় কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করেছে। প্রথমত, ব্যাংকগুলো খেলাপি ও অনাদায়ী ঋণের চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সরকারকে বারবার ব্যাংক ও খাতভিত্তিক সংকট সামাল দিতে গিয়ে উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে আস্থার ক্ষয়—মানুষ যখন ব্যাংক, বাজার বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশ্বাস হারায়, তখন অর্থনীতি তার স্বাভাবিক গতি হারায়।
নবোদয়/ জেডআরসি/ ০৫ জানুয়ারি ২০২৬