দিল্লির ‘না’, ঢাকার নিষেধাজ্ঞা
>> বিসিবির প্রস্তাব সরাসরি নাকচ আইসিসির
>> বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাক ফায়ার হওয়ার ঝুঁকি!
>> আবেগ দিয়ে কূটনীতি সামলোনা কঠিন
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৭:৩১ এএম
শেয়ার করুন:

আদিত্য আজাদ, ঢাকা
৭ জানুয়ারি, ২০২৬ : বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটে গত ২৪ ঘণ্টায় যে কূটনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, তা খেলার মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে এখন রাষ্ট্রীয় দপ্তরে। রয়টার্স এবং টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনগুলো একসূত্রে গাঁথলে যে চিত্রটি দাঁড়ায়, তা স্পষ্ট: ক্রিকেট এখন আর নিছক বিনোদন নয়, বরং ভূ-রাজনীতির দাবার গুটি।
রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসির কাছে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন জানিয়েছে। বিসিবি চায়, ভারতের মাটিতে নির্ধারিত বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সরিয়ে কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে নেওয়া হোক। কারণ হিসেবে তারা খেলোয়াড়দের ‘নিরাপত্তা শঙ্কা’র কথা উল্লেখ করেছে।
কিন্তু এই চিঠির কালি না শুকাতেই টাইমস অফ ইন্ডিয়া তাদের প্রতিবেদনে আইসিসির কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, আইসিসি বিসিবির এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। এমনকি, নির্ধারিত ভেন্যুতে খেলতে অস্বীকৃতি জানালে বাংলাদেশকে পয়েন্ট কর্তন বা টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কারের মতো শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, বিসিবি এই ‘আল্টিমেটাম’-এর বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, আলোচনা চলছে এবং কোনো শাস্তিমূলক হুমকি আসেনি। অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যম এবং বোর্ডের তথ্যের মধ্যে একটি বড় ফারাক দৃশ্যমান।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই রয়টার্স দ্বিতীয় বোমাটি ফাটায়। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ঘটনার অনুঘটক—কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের বাদ পড়া।
রয়টার্সের ভাষ্যমতে, সরকার এবং বিসিবি মনে করছে, মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কেবল ‘ক্রিকেটীয়’ বা ‘ফর্মজনিত’ নয়; বরং এর পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ক্রিকেটীয় স্নায়ুযুদ্ধ কাজ করছে। যদিও কোনো সূত্রই নিশ্চিত করেনি যে বিসিসিআই সরাসরি এই নির্দেশ দিয়েছে, তবে ঢাকার নীতিনির্ধারকদের কাছে টাইমিংটি সন্দেহজনক মনে হয়েছে।
এখানেই পরিস্থিতির কৌতুকপূর্ণ দিকটি উন্মোচিত হয়। একটি প্রাইভেট ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ থেকে একজন খেলোয়াড় বাদ পড়া পেশাদার খেলার খুব স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু এর জবাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরো টুর্নামেন্টের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া—যেন মশা মারতে কামান দাগার নামান্তর।
এতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) আয়ের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি না তা তর্কসাপেক্ষ, তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা যে বিনোদন থেকে বঞ্চিত হলেন, তা নিশ্চিত। কূটনীতিতে একে বলা হয় ‘সিগনালিং’—প্রতিপক্ষকে বার্তা দেওয়া, যদিও সেই বার্তায় নিজের ক্ষতিই বেশি হয়।
বিশ্লেষণের জায়গা থেকে দেখলে, বিসিবি এখন ‘ব্লিঙ্ক’ গেমে লিপ্ত। ভারত ও শ্রীলঙ্কা ২০২৬ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক। ভারত থেকে ম্যাচ সরিয়ে নেওয়া লজিস্টিক এবং অর্থনৈতিকভাবে আইসিসির জন্য প্রায় অসম্ভব।
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট সঠিক হলে, আইসিসি তার সবচেয়ে বড় বাজার (ভারত) এবং লজিস্টিক সুবিধার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। বিসিবির ভেন্যু বদলানোর দাবিটি সম্ভবত দরকষাকষির একটি কৌশল, যা এখন ব্যাকফায়ার করার ঝুঁকিতে রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত, এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের বর্তমান আঞ্চলিক অবস্থানের একটি জটিল চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশ দেখাতে চাইছে যে, তারা ভারতের আধিপত্যের কাছে মাথা নত করবে না, এমনকি সেটা ক্রিকেটের মাঠে হলেও।
কিন্তু আবেগ এবং বাস্তবতার লড়াইয়ে সাধারণত বাস্তবতাই জয়ী হয়। মুস্তাফিজের বাদ পড়া বা ভেন্যু নিয়ে আপত্তি—সবই হয়তো বৈধ ক্ষোভ, কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেটের বর্তমান কাঠামোতে দাঁড়িয়ে আইসিসি বা ভারতকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো ‘লিভারেজ’ বা শক্তি ঢাকার হাতে আছে কিনা, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
নবোদয়/ এএ/ জেডআরসি/ ০৭ জানুয়ারি ২০২৬