২০২৬-এর বাংলাদেশ প্যারাডক্স
বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষ: অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যেই গাজায় ‘স্থিতিশীলতা মিশনে’ যোগ দিতে ওয়াশিংটনে ঢাকার প্রস্তাব; লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার।
ভোটের বাস্তবতা: ১৪৮ দেশে ব্যালট পৌঁছালেও, দেশের ভেতরে নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে টার্গেটেড কিলিং ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার।
কূটনৈতিক শৈত্যপ্রবাহ: নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম স্থগিত; ক্রিকেট বোর্ডেও ‘দেশি-বিদেশি’ বিভাজনের ছায়া।
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৬:৪৬ এএম
শেয়ার করুন:

আদিত্য আজাদ, ঢাকা
(১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ : বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ)
জাতীয় নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে। একদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি-পরবর্তী আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা মিশনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ, অন্যদিকে দেশের ভেতরে বাড়তে থাকা সহিংসতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কূটনৈতিক সতর্কতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে।
গাজায় মিশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ওয়াশিংটনে মার্কিন কূটনীতিকদের কাছে বাংলাদেশ গাজায় সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা মিশনে অংশ নিতে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এমন একটি মিশন গঠনের আলোচনা চলছে। তবে এই মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে—সেনা, পুলিশ না অন্য কোনো সহায়ক কাঠামো—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। নির্বাচনের আগে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এই বাস্তবতায় বিদেশে বড় পরিসরের দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন তাঁরা।
নির্বাচন ও সহিংসতা
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রবাসী ভোটারদের জন্য ১৪৮টি দেশে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো শুরু হয়েছে। বারনামা ও আনাদোলু এজেন্সি এই উদ্যোগকে লজিস্টিক দিক থেকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে একই সময়ে রয়টার্সের গ্রাউন্ড রিপোর্টে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে সহিংসতা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির এই অবনতি ভোটের পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক অঙ্গনে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দ্য উইকলি ব্লিত্জ–এর মতো কিছু অনলাইন আউটলেট আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতির দাবি তুলেছে। এসব প্রতিবেদনের তথ্যগত বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, মূলধারার রাজনীতিতে শক্তিশালী বিরোধী অংশগ্রহণের অভাব আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজরে পড়েছে।
তাঁদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের জন্য যে ন্যূনতম রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রয়োজন, তা বর্তমানে স্পষ্ট নয়। ফলে আসন্ন নির্বাচনটি কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে—সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কূটনীতিতে সতর্ক সংকেত
এই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে কূটনীতিতেও। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় মিশনগুলো ভিসা কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। কূটনৈতিকভাবে একে ‘প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ’ বলা হলেও, এর ফলে চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক যাতায়াতে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা মূল্যায়নের একটি ইঙ্গিতও বটে।
ক্রীড়াঙ্গনেও রাজনৈতিক ছায়া
রাজনীতির উত্তাপ ছড়িয়েছে ক্রীড়াঙ্গনেও। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বিসিবির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কথা উঠে এসেছে। সেখানে একজন বোর্ড কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে ‘ইন্ডিয়ান এজেন্ট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে ক্রীড়া ও রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাধুলায় রাজনৈতিক ভাষা ও জাতীয়তাবাদী অভিযোগের ব্যবহার সামাজিক সহনশীলতার সংকটকেই প্রতিফলিত করে।
সামগ্রিক চিত্র
২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশ এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তিরক্ষী হিসেবে ভূমিকা রাখার আগ্রহ যেমন রয়েছে, তেমনি দেশের ভেতরে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও আস্থার সংকটও স্পষ্ট। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নতুন সরকার আনতে পারে, তবে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতে, আস্থার এই সংকট কাটাতে সময় ও কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগ—দুটোরই প্রয়োজন হবে।
নবোদয়/ এএ/ জেডআরসি/ ১৪ জানুয়ারি ২০২৬