দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির নতুন চাল
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন: খালেদা জিয়ার প্রয়াণে একটি যুগের সমাপ্তি এবং তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের বিশ্লেষণ।
কূটনৈতিক বাঁক বদল: ১৪ বছর পর পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ এবং যুদ্ধবিমান ক্রয়ের গুঞ্জনে ঢাকার নতুন কৌশলগত অবস্থান।
দিল্লির অসন্তোষ: সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও হামলার ব্যাখ্যা নিয়ে ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্রমাবনতি।
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৬:৪৫ এএম
শেয়ার করুন:
আদিত্য আজাদ, ঢাকা
১০ জানুয়ারি, ২০২৬ : বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ একটি দীর্ঘ শোকবার্তা প্রকাশ করেছে। তাদের বিশ্লেষণে খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রধান চরিত্র এবং নারী ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়কালের একজন দুই বারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
একই সময়ে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানিয়েছে, বিএনপির নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিক পালাবদল ঘটেছে এবং তারেক রহমান দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। লন্ডনে দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষ করে দলের শীর্ষ পদে তার এই আরোহন নির্বাচনের আগে দেশের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ; যদিও পারিবারিক উত্তরাধিকারের এই রাজনীতিতে চমকের চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি স্পষ্ট।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ যে দ্রুত গলছে, তার প্রমাণ হিসেবে ‘ডন’ এবং ‘দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন’ ১৪ বছর পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর খবরটিকে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং পিআইএ-এর ঢাকা-করাচি রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালুর এই সিদ্ধান্তকে তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘উষ্ণতা’ হিসেবে দেখছে।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলা শীতল সম্পর্কের পর হঠাৎ এই আকাশপথ খুলে দেওয়া কেবল যাত্রীদের সুবিধার্থে নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো কূটনৈতিক সমীকরণ যা সাধারণের চোখের আড়ালেই তৈরি হয়েছে।
এই সমীকরণের আরও জটিল দিকটি উন্মোচন করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’, যেখানে পাকিস্তানের জেএফ-১৭ (JF-17) যুদ্ধবিমান বিক্রির তোড়জোড় এবং ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতি’র বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের টানাপড়েনকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির বাজার বড় করতে চাইছে।
ঢাকার আকাশে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের ওড়ার স্বপ্ন হয়তো ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের, কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যে দিল্লির প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে বিকল্প মিত্র খুঁজছে, এই ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতি’ তারই এক অকাট্য ইঙ্গিত।
স্বাভাবিকভাবেই, ঢাকার এই গতিবিধি নয়াদিল্লির নজর এড়ায়নি এবং তার প্রতিফলন দেখা গেছে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর প্রতিবেদনে। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা এবং সে বিষয়ে ঢাকার দেওয়া ব্যাখ্যাকে ভারত সরকার ‘উদ্বেগজনক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে কড়া সমালোচনা করেছে।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্নে দিল্লির এই শক্ত অবস্থান কেবল মানবাধিকারের উদ্বেগ নয়, বরং প্রতিবেশী দেশে নিজেদের প্রভাব ক্ষুণ্ণ হওয়ার হতাশাও এর সঙ্গে মিশে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে পুরোনো মিত্র ভারতের সঙ্গে বিশ্বাস ও আস্থার সংকট, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে গড়ে ওঠা কৌশলগত সখ্যতা—এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা ঢাকার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ২০২৬ সালটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষার বছর হতে যাচ্ছে, যেখানে আবেগের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থই মুখ্য হয়ে উঠবে।
পরিশেষে, ক্ষমতার পালাবদল আর আন্তর্জাতিক মোড়লদের এই দড়ি টানাটানিতে সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কী জুটবে, তা এখনো অনিশ্চিত। শোক, সমরাস্ত্রের ব্যবসা আর কূটনৈতিক চাপানউতোরের ভিড়ে জনজীবনের প্রকৃত সমস্যাগুলো যেন আবারও কোনো এক দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক নাটকের ফাইলে চাপা না পড়ে যায়।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে ঠিকই, তবে তা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে নাকি পরাশক্তিগুলোর দাবার ঘুঁটি হিসেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
নবোদয়/ এএ/ জেডআরসি/ ১০ জানুয়ারি ২০২৬