নিরাপত্তা, ট্রানজিট ও বাণিজ্য বৈষম্যের খতিয়ানে নতুন মোড়
বিএনপি জোটের নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সম্পর্কে বাঁকবদল ঘটতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় দুই দেশে পুনরায় ভিসা সেবা স্বাভাবিক করতে শুরু করেছে। এটি সম্পর্কের একটি আংশিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিলেও, গত দশকের সেই উচ্চ-আস্থার সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ।
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০৬:৩৬:১৬ পিএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবেই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বাণিজ্য, জ্বালানি ও ট্রানজিটের ক্ষেত্রে ভারতের হাতে রয়েছে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা।
অন্যদিকে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যকে ঘিরে থাকা এবং বঙ্গোপসাগরের সংযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করায় বাংলাদেশও এই অঞ্চলে ‘গেটকিপার’ বা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে।
এই ভৌগোলিক ও কাঠামোগত বৈষম্য নতুন কিছু নয়। তবে গত তিন বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন যা এসেছে, তা হলো কীভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সরাসরি দুই দেশের অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।
দৃশ্যপটের আমূল পরিবর্তনে কূটনীতির পালাবদল
২০২৩ সালের মার্চে ভার্চুয়ালি ‘ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’-এর উদ্বোধন এবং সেপ্টেম্বরে জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে ডিজিটাল পেমেন্ট, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত তিনটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ সময় সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
এই সম্পর্কের চূড়ান্ত পর্যায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়। সে সময় ১০টি সমঝোতা স্মারক সই হয় এবং তিস্তা নদীর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কারিগরি দল পাঠানোর ঘোষণা দেয় ভারত (যদিও কোনো পানিবণ্টন চুক্তি হয়নি)।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দৃশ্যপট পুরোপুরি পাল্টে যায়। ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার অনুরোধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নজিরবিহীন কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ঢাকায় ভারতীয় মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায় এবং দুই দেশই পাল্টাপাল্টি ভিসা ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ আরোপ করে।
অবশেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোটের নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সম্পর্কে বাঁকবদল ঘটতে থাকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি পাঠান এবং ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এরই ধারাবাহিকতায় দুই দেশে পুনরায় ভিসা সেবা স্বাভাবিক করতে শুরু করেছে। এটি সম্পর্কের একটি আংশিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিলেও, গত দশকের সেই উচ্চ-আস্থার সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ।
নিরাপত্তা ও সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে আস্থার সংকট
মূল সংকট রয়ে গেছে ৪ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ স্থলসীমান্তে। বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক চলমান থাকলেও সীমান্তে প্রাণহানি এবং ‘পুশ-ইন’-এর অভিযোগ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে রেখেছে।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সীমান্তে ৩০ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। গত এক দশকে এই নিহতের সংখ্যা ২৯৬ জন, যার বড় অংশের জন্যই বিএসএফের গুলিকে দায়ী করা হয়। রাজনৈতিক পালাবদলের সময় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সার্বভৌমত্ব এবং সমতার প্রশ্নে এই পরিসংখ্যানগুলো প্রবলভাবে সামনে আসে।
ট্রানজিট, কানেক্টিভিটি এবং অমীমাংসিত তিস্তা
কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাতে সুস্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য সরবরাহের ব্যয় ও সময় কমাতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য অপরিহার্য। অভ্যন্তরীণ নৌ-প্রটোকল এবং ২০২৩ সালে চালু হওয়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের ব্যবহার ভারতকে এই সুবিধা দিচ্ছে। তবে এর বিনিময়ে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত ‘ফি’ বা মাসুল পাচ্ছে কিনা, তা নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে তুমুল বিতর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে, কানেক্টিভিটির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও অমীমাংসিত ইস্যু হলো অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে তিস্তা। শিলিগুড়ি করিডোরের নিকটবর্তী হওয়ায় তিস্তা নদী এখন ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে চীন একটি বিশাল মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে।
বাণিজ্য বৈষম্য এবং বাজার রাজনীতি
দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বিশাল হলেও তা চরমভাবে বৈষম্যমূলক। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১১.০৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করেছে মাত্র ১.৮৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ, ভারতের অনুকূলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ৯.২২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল হিসেবে ভারত মূলত তুলা, জ্বালানি তেল, যানবাহন ও যন্ত্রপাতি রপ্তানি করে। অন্যদিকে, ভারতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হলো তৈরি পোশাক।
২০২৫ সালে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রাজনীতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারত তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য পাঠানোর ট্রানজিট সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়। এ ছাড়া ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তে সরাসরি ট্রাক পারাপারের অনুমতি না থাকায় পণ্য খালাস ও ওঠাতে গড়ে ১৩৮ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়, যা এই বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
জ্বালানি, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা
বাণিজ্যিক উত্তেজনার মাঝেও জ্বালানি খাত দুই দেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীল রেখেছে। ভারত থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে।
এ ছাড়া নেপাল থেকে ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ত্রিপক্ষীয় চুক্তিও বাস্তবায়িত হয়েছে। ‘ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে ডিজেল আমদানি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে বাণিজ্যের তুলনায় সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ বেশ হতাশাজনক। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ভারতের মোট এফডিআই স্টকের পরিমাণ প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৩১.৫১ মিলিয়ন ডলার।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও তৃতীয় পক্ষের প্রভাব
শেখ হাসিনার শাসনামলে সীমান্ত হত্যা বা তিস্তার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে রাজনৈতিকভাবে চেপে রাখা হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
একইসঙ্গে তৃতীয় পক্ষের প্রভাবও স্পষ্ট। চীনের অবকাঠামো ঋণ ও তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহ ভারতের জন্য একটি বড় মাথাব্যথা। অন্যদিকে, বাণিজ্য ও সুশাসনের শর্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবও এই অঞ্চলে দৃশ্যমান। এ ছাড়া মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা এবং দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বোঝা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।
আগামীর পথনকশা: সমাধানের উপায় কী?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে হলে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি:
১. সীমান্ত ব্যবস্থাপনা: গুজব ও উত্তেজনা রোধে যৌথ সীমান্ত দুর্ঘটনা পর্যালোচনা সেল গঠন করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা।
২. বাণিজ্য সহজীকরণ: সীমান্তে ঘণ্টার পর ঘন্টা দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে কাস্টমস আইটি সিস্টেমের সমন্বয় এবং ট্রাস্টেড ট্রেডার প্রোগ্রাম চালু করা। হঠাৎ কোনো বন্দর বা রুটে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে পূর্বাভাস ও আলোচনার ব্যবস্থা রাখা।
৩. তিস্তা ও কানেক্টিভিটি: ট্রানজিট রুটের আয়-ব্যয়ের (ফি, সময় বাঁচানো, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি) একটি স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করা। তিস্তার ক্ষেত্রে ‘চুক্তি না হলে কিছুই নয়’ অবস্থান থেকে সরে এসে অন্তর্বর্তীকালীন তথ্য বিনিময় ও যৌথ বন্যা ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া।
৪. রাজনৈতিক সম্পর্ক: সম্পর্ককে কেবল নির্দিষ্ট কোনো শাসকদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সাথে ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
২০২৬ সালের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাস, ভূগোল এবং অর্থনীতির অমোঘ নিয়মে দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তবে এই সম্পর্ককে টেকসই করতে হলে বাণিজ্য বৈষম্য কমানো, সীমান্তে হত্যা বন্ধ এবং পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে আস্থার সংকট দূর করার কোনো বিকল্প নেই।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬