বন্ধুত্ব থেকে শত্রুতার শুরু যেভাবে
কাগজে-কলমে এই দুই দেশের সামরিক শক্তির পার্থক্য আকাশ-পাতাল। লন্ডনভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (আইআইএসএস) এবং রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শক্তিতে পাকিস্তান বহুগুণ শক্তিশালী।
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১২:৩৫:৫৭ পিএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি আবারো চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশি এবং একসময়ের মিত্র দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাত। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ দেশটির বিভিন্ন প্রধান শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।
অন্যদিকে, এই হামলার প্রতিবাদে আফগান বাহিনীও স্থলপথে এবং সীমান্ত চৌকিগুলোতে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ শুরু করেছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন সরাসরি যুদ্ধের দিকে মোড় নিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ এই পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘কার্যত যুদ্ধাবস্থা’ এবং প্রকাশ্য যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি জানান যে, আফগান সীমান্তে শুরু হওয়া সেনা অভিযান আসলে তালেবানের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যের সীমা ফুরিয়ে গেছে। এখন সরাসরি যুদ্ধের সময়।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, তার দেশের বাহিনী তালেবানকে গুঁড়িয়ে দিতে প্রস্তুত এবং সম্পূর্ণ সক্ষম।
কেন এই যুদ্ধাবস্থা?
২০২১ সালে যখন তালেবানরা কাবুলের ক্ষমতায় আসে, তখন পাকিস্তান তাদের বিপুলভাবে স্বাগত জানিয়ে ছিল। তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, আফগানরা দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙেছে। কিন্তু সেই আনন্দ এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক খুব বেশিদিন টেকেনি। বর্তমানে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বিরোধের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, পাকিস্তানের অভিযোগ হলো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) বা পাকিস্তানি তালেবানের শীর্ষ নেতারা আফগানিস্তানে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে এবং সেখান থেকেই তারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নিয়মিত হামলা পরিচালনা করছে।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও (যেমন- বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ) আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করছে বলে ইসলামাবাদ অভিযোগ তুলেছে।
তৃতীয়ত, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ‘ডুরান্ড লাইন’ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমান্তকে কখনোই স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের যুক্তি হলো, এটি একটি ঔপনিবেশিক সীমানা, যা জাতিগত পশতুন এলাকাগুলোকে অন্যায়ভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, কাবুল এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। উল্টো তারা দাবি করেছে যে, পাকিস্তান তাদের শত্রু সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) যোদ্ধাদের নিজেদের মাটিতে আশ্রয় দিয়েছে।
সংঘাতের সূত্রপাত ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের বাজাউর জেলায় টিটিপির হামলায় ১১ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহতের ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পাকিস্তান দাবি করেছে যে, সাম্প্রতিক এই আত্মঘাতী হামলাগুলোর পেছনে আফগানিস্তানের সরাসরি হাত রয়েছে, এমন অকাট্য প্রমাণ তাদের কাছে আছে। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’ নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে এবং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালায়।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, রাজধানী কাবুল, দক্ষিণ-পূর্বের পাকতিয়া প্রদেশ এবং দক্ষিণের কান্দাহারে ‘আফগান তালেবানের প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুতে’ এই হামলা চালানো হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই হামলায় আফগানিস্তানের দুটি ব্রিগেড সদর দপ্তর, একটি গোলাবারুদ ডিপো এবং বেশ কিছু তালেবান অবস্থান ধ্বংস করা হয়েছে।
এ ছাড়া ওয়ালি খান সেক্টর, শাওয়াল সেক্টর, বাজাউর সেক্টর এবং আঙ্গুর আড্ডার তালেবান চৌকিতেও হামলা হয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের চিত্রল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররাম এবং বাজাউর জেলাতেও আফগান তালেবান বাহিনীকে লক্ষ্য করে অভিযান চলছে। এই সংঘাতের ফলে উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে, তবে তাদের দেওয়া তথ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানিয়েছেন, চলমান অভিযানে ২৭৪ জন আফগান তালেবান সেনা ও জঙ্গি নিহত এবং ৪ শতাধিক আহত হয়েছেন। এছাড়া তালেবানদের ৭৩টি চৌকি ধ্বংস, ১৭টি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং অন্তত ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও কামান ধ্বংস করা হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি সকালে জানিয়েছিলেন যে, হামলায় ১৩৩ জন তালেবান সদস্য নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, তালেবান সরকার দাবি করেছে, তাদের মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ পাকিস্তানের দাবি নাকচ করে বলেছেন, হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে।
আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা পাল্টা হামলা চালিয়ে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং দুটি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯টি চৌকি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তবে পাকিস্তান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত অক্টোবর মাস থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে লড়াইয়ের কারণে স্থলসীমান্ত অনেকাংশে বন্ধ থাকলেও, আফগান নাগরিকদের ফেরার জন্য তোরখাম ক্রসিংটি খোলা রাখা হয়েছে। তবে সেখানেও গোলাবর্ষণ ও বন্দুকযুদ্ধের খবর পাওয়া গেছে।
সামরিক শক্তিতে কে কতটা এগিয়ে?
কাগজে-কলমে এই দুই দেশের সামরিক শক্তির পার্থক্য আকাশ-পাতাল। লন্ডনভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ (আইআইএসএস) এবং রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শক্তিতে পাকিস্তান বহুগুণ শক্তিশালী।
সেনাসংখ্যা: পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছে (৫ লাখ ৬০ হাজার সেনাবাহিনীতে, ৭০ হাজার বিমানবাহিনীতে এবং ৩০ হাজার নৌবাহিনীতে)। অন্যদিকে আফগানিস্তানে তালেবানের সক্রিয় যোদ্ধা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার, যা তারা ২ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে।
স্থলশক্তি: পাকিস্তানের কাছে প্রায় ৬ হাজার সাঁজোয়া যান এবং ৪ হাজার ৬০০টির বেশি আর্টিলারি বা ভারী কামান রয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের কাছে কিছু সোভিয়েত আমলের ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর কার্যক্ষমতা বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ।
আকাশপথ ও পারমাণবিক শক্তি: পাকিস্তানের অন্তত ৪৬৫টি যুদ্ধবিমান এবং ২৬০টিরও বেশি হেলিকপ্টার রয়েছে। বিপরীতে, আফগানিস্তানের কার্যকর কোনো বিমানবাহিনী নেই এবং তাদের হাতে থাকা গুটিকয়েক বিমান ও হেলিকপ্টার উড্ডয়নযোগ্য কি না, তা নিশ্চিত নয়।
সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, পাকিস্তান ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড সমৃদ্ধ একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, যেখানে আফগানিস্তানের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই। তবে আফগানিস্তানের পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং তালেবানদের কয়েক দশকের দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের অন্যতম বড় শক্তি।
বিশ্লেষকদের মত ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
টিটিপি বা পাকিস্তান তালেবান ২০০৭ সালে গঠিত হয় এবং ২০১২ সালে নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর তারাই হামলা করেছিল। একসময় তারা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান তালেবানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করলেও, এখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
এসিএলইডি-এর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক পার্ল পান্ড্য মনে করেন, আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ইচ্ছুক নয়। কারণ, তাদের পুরোনো সখ্যের পাশাপাশি টিটিপি যোদ্ধারা আফগানিস্তানে তালেবানের প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সে (আইএসকেপি) যোগ দিতে পারে এমন একটি ভয় আফগান তালেবানদের রয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলেছেন, এই সংঘর্ষ অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। এটি কয়েক মাসের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের ফল এবং পাকিস্তানের কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ২০২১ সালে বিদেশি বাহিনী প্রত্যাহারের পর থেকে এই দুই দেশের মধ্যে অন্তত ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, পবিত্র রমজান মাসে এই সংঘাতের জেরে ভারত তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা। জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
ইরান দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে মতভেদ দূর করার অনুরোধ করেছে এবং রাশিয়া এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থেকে আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, পাকিস্তান তাদের সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে। অন্যদিকে আফগানিস্তানও গেরিলা হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
আধুনিক প্রযুক্তি আর ভারী অস্ত্রে সুসজ্জিত পাকিস্তান তালেবানের এই গেরিলা কৌশলকে বুঝে সহজে কাবু করতে পারবে? নাকি এই যুদ্ধ এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের দিকে এগোবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬