ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম ও বিমা খরচ বাড়লে দেশে বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ এবং সার উৎপাদনের খরচ লাফিয়ে বাড়বে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতির চাপ নেমে আসবে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।
রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬ । ০৩:৩৮:৪৫ পিএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
বিশ্বজুড়ে আবারও বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও শিপিং রুটে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্যমতে, বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং কাতারের এলএনজির বড় অংশ এই রুটেই পরিবাহিত হয়। বাংলাদেশ এই যুদ্ধের অংশ না হলেও পরাশক্তিদের সংঘাতের চরম মূল্য ঠিকই ঢাকার অর্থনীতিকেও চোকাতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে নাজুক জায়গা হলো জ্বালানি খাত, যার ৬৫-৭০ শতাংশই কাতার, সৌদি আরব ও আমিরাতের মতো দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ যে ৫.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন এলএনজি আমদানি করেছে, তার একটি বড় অংশই এসেছে স্পট মার্কেট থেকে। এখন হরমুজে উত্তেজনা মানেই স্পট মার্কেটে দামের আগুন।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম ও বিমা খরচ বাড়লে দেশে বিদ্যুৎ, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ এবং সার উৎপাদনের খরচ লাফিয়ে বাড়বে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতির চাপ নেমে আসবে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।
জ্বালানির এই ধাক্কার পাশাপাশি লোহিত সাগর ও সুয়েজ রুটের অচলাবস্থা রপ্তানি খাতের জন্য তৈরি করেছে আরেক মৃত্যুফাঁদ। আইএমএফের পরিসংখ্যান বলছে, চব্বিশ সালের শুরুতেই সুয়েজ খাল দিয়ে বাণিজ্য ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
সংঘাতের কারণে বাধ্য হয়ে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে গেলে জাহাজের ভাড়া, ইনস্যুরেন্স ও সময়—তিনটিই বাড়বে। এতে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান শর্ত ‘লিড টাইম’ বা সময়মতো ডেলিভারি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
দেরি হলে অর্ডার বাতিল বা জরিমানার ঝুঁকির পাশাপাশি আইএমএফ ও ইউএনসিটিএডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপ-আমেরিকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমলে বাংলাদেশের পোশাকের বৈশ্বিক চাহিদাতেও অনিবার্য ধস নামবে।
আরেকটি বড় অশনিসংকেত হলো আমাদের ডলার আয়ের সবচেয়ে বড় খুঁটি মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স। সেখানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে শ্রমবাজার, নির্মাণ প্রকল্প এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে চাকরি হারানো এবং প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফিরে আসার চাপ তৈরি হতে পারে, যা সরাসরি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আঘাত হানবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ও রপ্তানি ভালো থাকায় সম্প্রতি বাংলাদেশের বাহ্যিক চাপ কিছুটা কমে রিজার্ভ স্থিতিশীল হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধজনিত এই ‘জ্বালানি ও শিপিং শক’ অর্থনীতিকে আবারও খাদের কিনারে ঠেলে দিতে পারে। জ্বালানি আমদানি বিল বাড়লে ডলার সংকট, সুদব্যয় এবং সাবসিডির চাপ আবারও ভয়াবহ রূপ নেবে।
বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু যুদ্ধের নির্মম অর্থনীতি থেকে পালানোর কোনো জাদুর কাঠিও হাতে নেই। এই ধাক্কা সামলাতে হলে জ্বালানি আমদানিতে ‘স্মার্ট হেজিং’, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা, বিকল্প শিপিং রুট খোঁজা এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখী করার কোনো বিকল্প নেই। নতুবা পরাশক্তিদের এই যুদ্ধের আগুনে পুড়তে হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০১ মার্চ ২০২৬