মিত্র থেকে চিরশত্রু
১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দারা মিলে এক গোপন অভ্যুত্থান ঘটায়। যাকে বলা হয় ‘অপারেশন অ্যাজাক্স’। নির্বাচিত মোসাদ্দেককে হটিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয় মার্কিন অনুগত রাজাকে। ইরানিদের মনে ঠিক তখন থেকেই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রথম বীজ বোনা হয়।
মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০৬:৪১:৩৩ পিএম
শেয়ার করুন:
আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
রাজনীতিতে নাকি চিরস্থায়ী মিত্র বা শত্রু বলে কিছু নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের দিকে তাকালে কথাটি মিথ্যে মনে হতে বাধ্য! একসময়ের গলাগলি করা দুই দেশ আজ একে অপরের ছায়াও মাড়াতে চায় না। আজকের এই চরম বৈরিতা কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বারবার বিশ্বাসভঙ্গ, রক্তপাত আর আধিপত্য বিস্তারের এক দীর্ঘ ইতিহাস।
ইতিহাসের পাতা উল্টে তাহলে দেখে নেওয়া যাক কীভাবে বন্ধু থেকে চিরশত্রুতে পরিণত হলো এই দুই দেশ।
১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান: অবিশ্বাসের প্রথম বীজ
গল্পের শুরুটা আজ থেকে সাত দশক আগে। ১৯৫০-এর দশকে ইরানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। ভীষণ জনপ্রিয় এই জাতীয়তাবাদী নেতা দেশের তেল-সম্পদ ব্রিটিশদের হাত থেকে বাঁচাতে ‘অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি’ জাতীয়করণ করে বসেন।
ব্যস, গায়ে আগুন লেগে যায় ব্রিটেনের। তারা বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের কান ভারী করতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র তখন সোভিয়েত কমিউনিজমের জুজুতে ভুগছে। তারা ভাবল, এই সুযোগে ইরান হয়তো সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়বে।
১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দারা মিলে এক গোপন অভ্যুত্থান ঘটায়। যাকে বলা হয় ‘অপারেশন অ্যাজাক্স’। নির্বাচিত মোসাদ্দেককে হটিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয় মার্কিন অনুগত রাজাকে। ইরানিদের মনে ঠিক তখন থেকেই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রথম বীজ বোনা হয়।
১৯৫৭ সালের পারমাণবিক চুক্তি
তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, আজ যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এত উদ্বিগ্ন, তার শুরুটা কিন্তু খোদ তাদের হাত ধরেই গোড়াপত্তন হয়েছিল!
১৯৫৭ সাল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইরানকে পারমাণবিক প্রযুক্তি দেয়। এক দশক পর একটি চুল্লি এবং ইউরেনিয়ামও উপহার দেয় ওয়াশিংটন।
ইরানিরা আজও বুক ফুলিয়ে বলে, ‘আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচির শুরুটা তো বৈধভাবেই তোমাদের হাত ধরে হয়েছিল!’ কিন্তু কে জানত, একদিন এই বন্ধুত্বের পারমাণবিক চুল্লিই পরিণত হবে দুই দেশের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ!
১৯৭৯ সালের বিপ্লব ও জিম্মি সংকট
এরপরই আসে সেই চূড়ান্ত বাঁক, যা দুই দেশের সম্পর্ককে চিরতরে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়। সাল ১৯৭৯। মার্কিন অনুগত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির স্বৈরাচারী শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে ইরানের সাধারণ মানুষ। শুরু হয় গণঅভ্যুত্থান, দেশ ছাড়তে বাধ্য হন পাহলভি। ক্ষমতায় আসেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, জন্ম হয় ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ ইরানের।
এই বিপ্লবের রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটে যায় এক অভাবনীয় ঘটনা। ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে একদল ক্ষুব্ধ ইরানি ছাত্র তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে ৫২ জন আমেরিকানকে ৪৪৪ দিনের জন্য জিম্মি করে রাখে।
এই ঘটনা মার্কিনিদের অহংকারে চরম আঘাত হানে। ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮০ সালে ইরানের সাথে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। সেই যে দরজা বন্ধ হলো, তা আজও খোলেনি।
আশির দশকের যুদ্ধ ও রক্তপাত
সম্পর্ক ছিন্ন করেই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি। শুরু হয় আরেক ভয়ংকর খেলা। আশির দশকে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ। ইরানের বিপ্লব যেন মধ্যপ্রাচ্যে ছড়াতে না পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র পেছন থেকে সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন ও মদদ দিতে থাকে। এর মধ্যেই ১৯৮৮ সালে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি।
মার্কিন নৌবাহিনীর একটি রণতরী ভুলবশত যাত্রীবাহী ‘ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫’-এ মিসাইল ছুড়ে বসে। মারা যান ২৯০ জন নিরপরাধ মানুষ। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রেগান দুঃখ প্রকাশ করলেও, আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো ক্ষমা চায়নি আমেরিকা।
এই অহংকার ইরানিদের মনে মার্কিন বিদ্বেষের আগুনকে দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দেয়। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা’ তকমা দিয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়।
নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়
এত কিছুর পরও কি দুই দেশের মেলবন্ধনের কোনো সুযোগ ছিল না? ছিল, কিন্তু তা নষ্ট হতেও সময় লাগেনি। ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর তালেবান ও আল-কায়েদা দমনে ওয়াশিংটন ও তেহরান সাময়িকভাবে হাত মিলিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, বরফ হয়তো গলবে।
কিন্তু ২০০২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশ এক ভাষণে ইরানকে ‘অ্যাক্সিস অফ ইভিল’ বা শয়তানের অক্ষ বলে আখ্যা দেন। এই এক কথাতেই সব সম্ভাবনা ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়। ইরান বুঝে যায়, আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য কোনোভাবেই শান্তি নয়, বরং তাদের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো।
২০১৫ থেকে ২০২০: সাময়িক শান্তি ও সোলাইমানি হত্যা
এরপর কেটে যায় অনেকগুলো বছর। অবশেষে ২০১৫ সালে দেখা দেয় এক চিলতে আশার আলো। বারাক ওবামার আমলে দীর্ঘ আলোচনার পর সই হয় ঐতিহাসিক ‘ইরান পারমাণবিক চুক্তি’। শর্ত ছিল, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করবে, বদলে আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। কিন্তু এই শান্তি টিকল মাত্র তিন বছর।
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে একতরফাভাবে এই চুক্তি বাতিল করে দেন এবং ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি চাপিয়ে দেন। সম্পর্ক এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকে যে, ২০২০ সালে ইরাকের বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল কাসেম সোলাইমানি।
এরপর ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ২০২৫ সালে ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন পারমাণবিক চুক্তির জন্য ৬০ দিনের আল্টিমেটাম চাপিয়ে দেন, যা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ইরান।
আসন্ন যুদ্ধের শঙ্কা: যেকোনো সময় হতে পারে মার্কিন হামলা?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার মূল কারণ হলো পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবিশ্বাস, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মার্কিন স্বার্থের সংঘাত, ইসরায়েল-ইরান বৈরিতা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে কৌশলগত টানাপোড়েন।
কোনো চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কখন ইরানে হামলা চালাতে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা মূলত চারটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট বা ‘সিনারিও’ দাঁড় করিয়েছেন। প্রথমত, যদি ট্রাম্প ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন এবং ইরানের কোনো নতুন প্রস্তাব খারিজ করে দেন, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আকস্মিক হামলা হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের দেওয়া দুই সপ্তাহের আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পর আগামী সপ্তাহের শুরু বা মাঝামাঝি সময়ে এই আক্রমণ ঘটতে পারে। তৃতীয়ত, রমজান মাস চলাকালীন মুসলিম মিত্রদের কথা বিবেচনা করে হয়তো ট্রাম্প অপেক্ষা করতে পারেন এবং ঈদের পরপরই হামলা চালাতে পারেন।
আর চতুর্থত, এই বিপুল সামরিক বহরের ব্যয়ভার দীর্ঘকাল বহন করা কঠিন হওয়ায় ট্রাম্প হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করতে পারেন; তবে এ সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তা ছাড়া, এই যুদ্ধে ইসরায়েল যুক্ত হলে ইরান যে সেখানেও পাল্টা হামলা চালাবে, তার আশঙ্কাও ক্রমশ প্রবল হচ্ছে।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬