ব্যারেল প্রতি দাম বাড়তে পারে ১৫০-২০০ ডলার
মার্কিন যৌথ বাহিনীর সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন একবার হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সংকটবিন্দু বলে বর্ণনা করেছিলেন। ইরান সেই বর্ণনাকেই নকশা হিসেবে নিয়েছে।
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০৩:৩৯:৫০ পিএম
শেয়ার করুন:

রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের সামুদ্রিক পথ হিসেবে পরিচিত। এটি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করে, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) তেল পরিবাহিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর এটিই প্রধান পথ।
এই প্রণালীটি শুধু একটি জলপথ নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক রুট হিসেবে পরিচিত। এই গুরুত্বপূর্ণ পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন সময় ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
মার্কিন যৌথ বাহিনীর সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন একবার হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সংকটবিন্দু বলে বর্ণনা করেছিলেন। ইরান সেই বর্ণনাকেই নকশা হিসেবে নিয়েছে।
বিশ্বের কৌশলগত জ্বালানি মজুত হয়তো দুই মাস পর্যন্ত ধাক্কা সামাল দিতে পারবে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইন প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল সরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন যায় প্রায় দুই কোটি ব্যারেল।
হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, তেল নিয়ন্ত্রণ মানেই জাতিকে নিয়ন্ত্রণ। এই মন্তব্য সময়ের সঙ্গে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইরানের নেতৃত্ব এই শিক্ষাকে স্পষ্টভাবেই গ্রহণ করেছে এবং তার ওপর ভিত্তি করেই সামরিক মতবাদ গড়ে তুলেছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে চীনের ভূমিকা। বেইজিং কেবল দর্শক নয়। প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৮৪ শতাংশই এশীয় বাজারের জন্য। চীন একাই তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক–চতুর্থাংশ এই পথের ওপর নির্ভর করে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিকল্প নেই, এমন নয়। ইরানের নৌ সম্পদ ধ্বংস করা, ড্রোনের ঝাঁক নিষ্ক্রিয় করা, মাইন পরিষ্কার করা এবং শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালি খোলা রাখার সক্ষমতা এখনো তাদের আছে। জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা এ কথা সতর্কতার সঙ্গে বলেন, এবং তা পুরোপুরি ভুলও নয়।
১৭ ফেব্রুয়ারি ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড (আইআরজিসি) সামরিক মহড়ার নাম করে হরমুজের ইনবাউন্ড শিপিং লেনের একটি অংশ কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেয়। শিল্প বিশেষজ্ঞরা এটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
৩ ফেব্রুয়ারি আইআরজিসির ছয়টি গানবোট হরমুজে একটি মার্কিন পতাকাবাহী ট্যাংকার আটকানোর চেষ্টা করে। ট্যাংকারটি মার্কিন রণতরী ইউএসএস ম্যাকফলের এসকর্টে নিরাপদে বেরিয়ে যায়। একই দিনে একটি মার্কিন এফ-৩৫ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের কাছে আসা একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করে।
মার্কিন পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সামুদ্রিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী, মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইরানের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা থেকে যতটা সম্ভব দূরে থেকে ওমানের পাশ ঘেঁষে চলতে বলা হয়েছে।
হরমুজ পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরের একমাত্র সামুদ্রিক সংযোগপথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় ২৫ শতাংশ এই পথে চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য হরমুজ দিয়ে বহন করা হয়। এই তেলের ৮৪ শতাংশই যায় এশিয়ায়।
চীন একা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল হরমুজের মধ্য দিয়ে আমদানি করে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যায় মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ হরমুজ বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে এশিয়ার। আন্তর্জাতিক আইনে হরমুজের সবচেয়ে সরু অংশের শিপিং লেনগুলো সম্পূর্ণভাবে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রের ভেতরে পড়ে, যা তেহরানকে ভূগোলগত সুবিধা দেয়।
ইরানের কাছে হরমুজ বাধাগ্রস্ত করার বেশ কয়েকটি উপায় রয়েছে নৌমাইন বিছানো, অ্যান্টিশিপ মিসাইলসহ দ্রুতগতির স্পিডবোট মোতায়েন, সেমি-সাবমার্সিবল ও সাবমেরিন ব্যবহার। ইরানের সংসদ গত বছর হরমুজ বন্ধের প্রস্তাব পাস করে রেখেছে।
তবে ইরানের নিজের জন্যও এটি বিপজ্জনক। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯৫ শতাংশই হরমুজের মধ্য দিয়ে যায়, যার প্রায় সবটাই চীনে রপ্তানি হয়। প্রণালি বন্ধ করলে ইরানের নিজের প্রধান আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে যাবে।
হরমুজ প্রণালি যদি আসলেই বন্ধ হয় তবে তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদী বন্ধ বা বড় ধরনের সংঘাতের ঘটনায় অপরিশোধিত তেলের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে পূর্ণ অবরোধ হলে অনেক বিশেষজ্ঞ ব্যারেলপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ ডলারের পূর্বাভাস দিচ্ছেন।
বিকল্প পথে সরবরাহ কতটা সম্ভব? সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইনগুলো হরমুজ বাইপাস করতে পারে, কিন্তু সেগুলোর সম্মিলিত ক্ষমতা হরমুজের মোট প্রবাহের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।
ইরাক, কাতার ও কুয়েতের কার্যত কোনো বিকল্প রুটই নেই। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব সম্পর্কে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক স্যামুয়েল রামানি সতর্ক করেছেন যে এই ধরনের বিঘ্ন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব ফেলবে।
এশিয়ার জন্য ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হবে। ভারতের অর্ধেক অপরিশোধিত তেল ও ৬০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজের মধ্য দিয়ে আসে। বাংলাদেশ কাতার থেকে যে এলএনজি আমদানি করে, তার পুরোটাই হরমুজ দিয়ে আসে।
বিকল্প সরবরাহকারী বা পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুদ না থাকায় বাংলাদেশের জন্য যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী বিঘ্ন বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করবে।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ওমান উপকূলের আরব সাগরে অবস্থান করছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ভূমধ্যসাগর হয়ে এই অঞ্চলে আসছে। এটি ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশ।
যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ খোলা রাখার প্রতিশ্রুতিতে অটল। তবে হুথিরা দুই বছর ধরে লোহিত সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীকে হয়রান করেছে এবং মার্কিন বাহিনী তাদের পুরোপুরি দমন করতে পারেনি। ইরানের সামরিক সক্ষমতা হুথিদের চেয়ে অনেক বেশি এবং হরমুজে তার ভূগোলগত অবস্থান তাকে বাড়তি সুবিধা দেয়।
ইরান ওপেকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং হরমুজের ঠিক পাশেই অবস্থিত একটি প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। আজকের হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান হরমুজে কতটুকু পদক্ষেপ নেবে তার ওপর নির্ভর করছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি।
এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত আছে। কিন্তু আজকের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলাচ্ছে। সর্বশেষ আপডেটের জন্য রয়টার্স, ব্লুমবার্গ ও আল জাজিরা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬