যুদ্ধের দামামা, কাঁপছে মধ্যপ্রাচ্য
রাশিয়ার দমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলেছেন- ‘শান্তির দূত তার আসল চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন এবার।’
রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬ । ০৩:২৩:২১ এএম
শেয়ার করুন:

জুবায়ের রহমান চৌধুরী, ঢাকা
পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ হামলা চালিয়ে এই উন্মাদনার পারদ জ্বালিয়ে দিয়েছে। যখন পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছিল, তখনই এই হামলার পরিকল্পনা সাজানো হয়।
রাশিয়ার দমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলেছেন- ‘শান্তির দূত তার আসল চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন এবার।’
এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক সংক্ষিপ্ত টিভি ভাষণে বলেছেন, এমন অনেক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ‘আর নেই’। রোববার (১ মার্চ) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেননি নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহু আরও বলেন, বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার ও ঊর্ধ্বতন পারমাণবিক কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ইরানি নাগরিকদের ‘রাজপথে নেমে কাজ শেষ করার’ আহ্বান জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মারা গেছেন এবং তার মরদেহ পাওয়া গেছে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করেছে। ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে। দিনভর পাল্টাপাল্টি আঘাতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ-আতঙ্ক ছড়ায়। আকাশপথ বিপর্যস্ত হয়। বিশ্ব রাজনীতি দুভাগে ভাগ হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি বড় যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে কিনা, সেই শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এখনই “বিশ্বযুদ্ধ শুরু” বলে নিশ্চিত করে বলার মতো কোনো সরকারি ঘোষণা বা প্রমাণ নেই। বরং দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বানই বাড়ছে।
➤ ইরানে হামলার পর বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসভবন সব বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবসহ প্রায় সব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে অনেক দেশ। উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে বিভিন্ন দেশ ও মহল থেকে। ইরানে হামলার আগেই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। যেমনটি সতর্কতা দেয়া হয়েছিল, ঠিক সেরকমই মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে যুদ্ধপরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরান আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে আক্রান্ত হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে হামলা করবে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পর ইরান সেই কাজটিই করেছে। তারা সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে।
হামলা ও পাল্টা হামলা
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান ইরানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০০ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলসহ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর ঘোষণা/দাবি করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে।
নিহত-আহত
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের বরাতে ইরানি রাষ্ট্রীয় টিভির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হামলায় অন্তত ২০১ জন নিহত এবং ৭৪৭ জন আহত। হামলার প্রভাব পড়েছে ইরানের ২৪টি প্রদেশে। উদ্ধার তৎপরতায় ২২০টির বেশি দল কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট বন্ধ, আকাশসীমা সংকট
হামলা-পাল্টা হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে আকাশসীমা বন্ধ/সীমিত করা হয়। এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। তুর্কিশ এয়ারলাইনসসহ একাধিক এয়ারলাইন বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট বাতিল/স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে?
এখন পর্যন্ত এটি “আঞ্চলিক যুদ্ধের” মতোই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সংঘাতের বিস্তার ঝুঁকি বাস্তব। কারণ একই দিনে ইরান, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নিয়ে সমান্তরাল উত্তেজনার খবর এসেছে।
বিশ্বযুদ্ধ বলতে সাধারণত একাধিক বড় শক্তির সরাসরি যুদ্ধ-জড়ানো বোঝায়। সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে, এমন নিশ্চিত ভিত্তি এখনও নেই। তবে ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে, এই আশঙ্কা জোরালো।
রেড ক্রস প্রধানের সতর্কবার্তা
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রেসিডেন্ট মিরজানা স্পোলজারিক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা বিপজ্জনক বিশৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, এই সামরিক উত্তেজনা পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের জন্য।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধের আইন মানা বাধ্যতামূলক, এটি কোনো বিকল্প নয়। আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাতে জেনেভা কনভেনশন প্রযোজ্য। হাসপাতাল, বাড়িঘর ও স্কুলের মতো বেসামরিক অবকাঠামোকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হবে। চিকিৎসাকর্মী ও জরুরি সেবাদাতাদের নিরাপদে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
ইরানে ট্রাম্পের হামলা অবৈধ ও অসাংবিধানিক
ইরানে ট্রাম্পের সামরিক হামলাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড জে. মার্কি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই হামলা মার্কিন কংগ্রেস অনুমোদন দেয়নি। ট্রাম্পের এই হামলা সমস্ত আমেরিকানের জন্য বিপদ বয়ে আনবে।
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের অবৈধ কর্মকাণ্ড একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য মারাত্মক হুমকি।
মার্কি বলেন, ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে ইরানের পারমাণবিক হুমকি অতি আসন্ন উল্লেখ করে তা অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছেন। এমনকি জুনে তার অবৈধ ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘বিধ্বস্ত’ করা হয়েছে বলে দাবি করার পরও ইরানের হুমকি আসন্ন-এটা বলেই যাচ্ছেন ট্রাম্প।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ করলো ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলার প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে ইরান। দেশটির নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কোনো জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক তেলবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের জন্য এই পথ বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে প্রায় ৮০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে।
➤ ইরানে যৌথ হামলা শুরু ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের
বিশ্বের মোট তেল ও জ্বালানি পরিবহনের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে রপ্তানিকৃত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল প্রতিদিন এই রুট অতিক্রম করে।
প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে, ব্যস্ত সময়ে প্রতি কয়েক মিনিট পরপর জাহাজ পারাপার হয়। সূত্র: রয়টার্স, এপি নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান, ইউরো নিউজ, আল জাজিরা, বিবিসি
নবোদয়/ জেডআরসি/ ০১ মার্চ ২০২৬