পাক-আফগান লড়াই-সংঘাত চরমে
খোদ ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে ‘ওপেন ওয়ার’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণার পর দুই দেশের সীমান্তজুড়ে চলছে ভয়াবহ বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ ও মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ। গত কয়েক ঘণ্টার এই নজিরবিহীন সংঘাতে উভয় পক্ষেই ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬ । ০৪:৪৫:২৮ পিএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা এখন আর কেবল বাকযুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ডুরান্ড লাইনজুড়ে শুরু হওয়া এই লড়াই এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রোববার (০১ মার্চ) সূর্য ওঠার আগেই বিকট বিস্ফোরণ আর মুহুর্মুহু গোলাগুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো কাবুল। গত এক সপ্তাহ ধরে ডুরান্ড লাইন সীমান্তে চলা তীব্র সংঘাত এবার সরাসরি ছড়িয়ে পড়ল রাজধানীর বুকে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে দুই প্রতিবেশির সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রত্যক্ষ সামরিক লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
খোদ ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে ‘ওপেন ওয়ার’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণার পর দুই দেশের সীমান্তজুড়ে চলছে ভয়াবহ বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ ও মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ। গত কয়েক ঘণ্টার এই নজিরবিহীন সংঘাতে উভয় পক্ষেই ব্যাপক প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দাবি করেছেন, পাকিস্তানি বাহিনীর চলমান তীব্র অভিযানে এ পর্যন্ত ৩৩১ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং অন্তত ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। শুধু প্রাণহানিই নয়, পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী তারা তালেবানের ১০৪টি চেকপোস্ট এবং ১৬৩টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস করে দিয়েছে।
তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল সামরিক ঘাঁটিতেই আটকে নেই। আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশের আসাদাবাদ শহরে আবাসিক এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সরাসরি গোলাবর্ষণে অন্তত ৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
যুদ্ধের ময়দানে তালেবানও ছেড়ে কথা বলছে না। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) আফগান গণমাধ্যম ‘টোলো নিউজ’ এক চাঞ্চল্যকর খবরে জানিয়েছে, নানগারহার প্রদেশে একটি পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে তালেবান বাহিনী। শুধু তাই নয়, বিমানটির পাইলটকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করার দাবিও করেছে তারা। যদিও পাকিস্তান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই চরম অবমাননাকর দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
আফগান বাহিনী পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার মিরানশাহ ও স্পিনওয়াম এলাকার সামরিক ক্যাম্পগুলোতে সরাসরি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় স্পিনওয়াম ঘাঁটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
চলমান এই সীমান্ত যুদ্ধের কারণে নাশকতার আশঙ্কায় পাকিস্তানের বান্নু জেলায় এরই মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। সেখানে স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণার পাশাপাশি পুলিশকে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়।
যুদ্ধের ময়দানের মতো কূটনৈতিক টেবিলেও পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত। তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের কথা বলা হলেও, পাকিস্তান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জায়েদি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, “কোনো সংলাপ হবে না। আফগানিস্তান থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে হবে। যেখানেই সন্ত্রাসীর খোঁজ পাওয়া যাবে, সেখানেই হামলা চালানো হবে।”
অন্যদিকে, তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে কূটনীতির পথ খোলা রাখলেও, নিজ ভূখণ্ড রক্ষায় সামরিক পদক্ষেপ থেকে একচুলও পিছু হটবে না তালেবান।
ডুরান্ড লাইনের এই আগুনে এখন শঙ্কিত পুরো বিশ্ব। জাতিসংঘ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, এই লড়াই আফগানিস্তানের বর্তমান মানবিক বিপর্যয়কে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবিলম্বে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামিয়ে দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাকিস্তানে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০১ মার্চ ২০২৬