সংকট, সম্ভাবনা ও সংস্কারের দোটানায় বাংলাদেশ
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি পূর্ণ স্বাধীনতাই না পায়, যদি নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ থেকেই যায়, তবে সংস্কারের এই উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাত খাদের কিনারা থেকে কিছুটা ফিরে এলেও, সংকটের মেঘ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১১:১০:২৪ এএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
কাঠামোগত দেউলিয়াত্বের কথা শুনেছেন? ইংরেজিতে যাকে বলে ‘সিস্টেমিক সলভেন্সি ক্রাইসিস’। শব্দটা শুনতে যেমন খটমট, এর ফলাফল তার চেয়েও ভয়াবহ।
সালটা ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে। উপর থেকে তাকালে দেশটাকে বেশ চকচকে মনে হয়। মতিঝিল কিংবা গুলশানের সুউচ্চ ব্যাংক ভবন, হিমশীতল কক্ষ, আর স্যুট-টাইপরা পরিপাটি কর্মকর্তা। কিন্তু এই জৌলুসের আড়ালে অর্থনীতির হৃৎপিণ্ডে যে রক্তক্ষরণ চলছে, তা কি আমরা টের পাচ্ছি?
সংখ্যায় গরমিল: শুভঙ্করের ফাঁকি বনাম রূঢ় বাস্তবতা
এতদিন আমাদের গেলানো হয়েছে ঘুমের ওষুধ। বলা হয়েছে, ব্যাংকে খেলাপি ঋণ মাত্র ৭ থেকে ৯ শতাংশ। কী চমৎকার হিসাব! কিন্তু পর্দা সরতেই বেরিয়ে এলো কঙ্কাল। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশেরও বেশি যা এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
আতঙ্কের আসল জায়গাটা আরও গভীরে
ব্যাংকিং খাতে ‘সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ’-এর পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা! সহজ কথায়, এস আলম বা বেক্সিমকোর মতো বিশাল গ্রুপগুলোর কাছে আটকে থাকা এই টাকার একটি বড় অংশ আর কোনোদিন ব্যাংকে ফেরত আসবে কিনা, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিছু সরকারি ব্যাংকের ১০০ টাকার মধ্যে ৭০ টাকাই এখন ঝুঁকির মুখে।
একীভূতকরণ ও আমানতকারী: শঙ্কা ও সমাধান
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২৫-এর ডিসেম্বরে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে জোড়াতালি দিয়ে বানানো হলো ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’। যার পোশাকি নাম ‘একীভূতকরণ’। কিন্তু ভেতরে শঙ্কা অন্য জায়গায়। আমানতকারীদের জমানো টাকার একাংশকে জোর করে ‘শেয়ারে’ রূপান্তর বা ‘Bail-in’ করার প্রক্রিয়া চলছে। অর্থাৎ, আপনি ব্যাংকে টাকা রেখেছিলেন নিরাপত্তার জন্য, এখন ব্যাংক বলছে ‘টাকা নেই, আপনি বরং আমাদের মালিক হয়ে যান!’
গ্রাহকদের এই উদ্বেগ স্বাভাবিক। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে ইতিহাসের একটি ‘আশার আলো’ও রয়েছে। আজকের এই পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৯২ সালের একটি ঘটনার দারুণ মিল আছে। ১৯৯১ সালে যখন বিশ্বজুড়ে বিসিসিআই (BCCI) কেলেঙ্কারির পর ব্যাংকটি ধসে পড়ে, তখন সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই জন্ম নিয়েছিল আজকের ‘ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড’ (ইবিএল)।
তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি যুগান্তকারী ‘পুনর্গঠন পরিকল্পনা’ হাতে নিয়েছিল:
১. সম্পদ সুরক্ষা: বিসিসিআই-এর স্থানীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তহবিলের সম্পূর্ণ ক্ষতি রোধ করা।
২. আমানতকারী যখন মালিক: সঞ্চয় হারানোর বদলে গ্রাহকদের নতুন ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার বানানো।
৩. কঠিন শুরু: ইবিএল যাত্রা শুরু করেছিল ৩৬৫ কোটি টাকার বিশাল ঋণাত্মক মূলধন নিয়ে। প্রথম পাঁচ বছর কোনো লভ্যাংশও দিতে পারেনি।
কিন্তু সুশাসন ও ধৈর্যের ফলে সেই রুগ্ন ব্যাংকটিই আজ দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক। আজকের ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর ক্ষেত্রেও যদি ইবিএল-এর মতো সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা যায়, তবে এই সংকট থেকেও ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব নয়।
স্বস্তির বাতাস, তবে আকাশ মেঘমুক্ত নয়
নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে, বর্তমান পরিস্থিতি একেবারে নৈরাশ্যজনক নয়। বিগত সময়ের তুলনায় কিছু জায়গায় স্বস্তি ফিরেছে:
স্বচ্ছতা: আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম নিয়োগের মাধ্যমে তথ্য গোপনের সংস্কৃতি ভাঙা হয়েছে। রোগ নির্ণয় করা চিকিৎসার প্রথম ধাপ।
জবাবদিহিতা: ‘রাঘববোয়ালদের ছোঁয়া যাবে না’—এই ধারণা পাল্টাচ্ছে। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এখন দৃশ্যমান।
নজরদারি: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে যথেচ্ছ ঋণ বিতরণ ও লুটপাটের সুযোগ কমেছে।
সংস্কারের পথে আমলাতান্ত্রিক দেয়াল
সবকিছু যখন ঠিকঠাক এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, তখনই সামনে এসেছে নতুন এক আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা। ব্যাংকিং খাতকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২’ সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। খসড়া ও প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অর্থ মন্ত্রণালয় এতে বাদ সেধেছে।
অর্থ উপদেষ্টা এই সংশোধনে ‘না’ বলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যুক্তি দেখানো হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে মৌলিক আইন সংশোধন বাস্তবসম্মত নয়। ফলে ফাইলটি এখন লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আটকে আছে। অথচ অর্থনীতিবিদরা বারবার বলে আসছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছায়া থেকে বের করতে না পারলে টেকসই সংস্কার অসম্ভব।
সম্ভাবনা ও সন্দেহের দোলাচল
২০২৬-২০২৭ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে এক অগ্নিপরীক্ষা। ১৯৯২ সালে ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনালের (বিসিসিআই) ছাইভস্ম থেকে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) উত্থান আমাদের দেখায় যে, সঠিক ব্যবস্থাপনায়-ও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে কে?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি পূর্ণ স্বাধীনতাই না পায়, যদি নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ থেকেই যায়, তবে সংস্কারের এই উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাত খাদের কিনারা থেকে কিছুটা ফিরে এলেও, সংকটের মেঘ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
ইবিএল-এর মতো সফল হতে হলে শুধু একীভূতকরণই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন লৌহদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা যা এই মুহূর্তে কিছুটা ফিকে মনে হচ্ছে।