প্রধান বাধা এক খাতের অর্থনীতি
যখন কোনো দেশের অর্থনীতির ৮০ শতাংশ একটা বা দুটো পণ্যের উপর নির্ভরশীল তখন সেই দেশ আন্তর্জাতিক বাজারের দামের উঠানামার কাছে জিম্মি হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চলে যায় নিজের হাত থেকে।
রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬ । ০৬:৪০:৩৭ পিএম
শেয়ার করুন:

রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা
১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর যখন মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, লি কুয়ান ইউ প্রকাশ্যে টেলিভিশনের সামনে কেঁদেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, এই ছোট্ট দ্বীপের টিকে থাকার কোনো কারণ নেই। প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। বিশাল বাজার নেই। কৌশলগত গভীরতা নেই। পানীয় জলটুকুও আসে প্রতিবেশি দেশ থেকে। তবে সময়ের পরিক্রমায় আজ সেই দেশের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের চেয়ে চব্বিশ গুণ বেশি।
ভিয়েতনাম দুটো পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং দুটোর বিরুদ্ধেই জিতেছে। রুয়ান্ডা মাত্র তিন দশক আগে এমন একটা গণহত্যার ভেতর দিয়ে গেছে, যে গণহত্যার কথা উঠলে এখনও পশ্চিমারা চোখ নামিয়ে নেয়। আজ রুয়ান্ডার কিগালি শহর আফ্রিকার সবচেয়ে পরিষ্কার শহর, ড্রোনে করে রক্ত পরিবহন হয় হাসপাতালে হাসপাতালে। এই দেশগুলো ছোট এবং সক্ষমতার দিক থেকে দুর্বল ছিল। কিন্তু তারা হারেনি। ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাহলে অন্য ছোট দেশ কেন পারছে না?
ছোট সীমানার দেশ শুধু সম্পদ কিংবা অবস্থানের কারণে হেরে যায় না। ছোট দেশ হারে তখনই, যখন সে নিজেই জানে না, সে কী হতে চায় এবং সেই না জানার সুযোগে বড় দেশগুলো তার হয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয়। ছোট দেশের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলো সম্পদ নির্ভরতা।
যখন কোনো দেশের অর্থনীতির ৮০ শতাংশ একটা বা দুটো পণ্যের উপর নির্ভরশীল তখন সেই দেশ আন্তর্জাতিক বাজারের দামের উঠানামার কাছে জিম্মি হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চলে যায় নিজের হাত থেকে।
ভূ-রাজনৈতিক নির্ভরতাকেও আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। প্রতিবেশি বড় শক্তির সাথে সম্পর্ক যদি শুধু একমুখী হয়, শুধু নিরাপত্তার জন্য বা বাজারের জন্য বড় দেশের মুখ চেয়ে থাকতে হয়, তাহলে সেই ছোট দেশ কার্যত একটা বাফার স্টেটে পরিণত হয়। তার নিজস্ব কোনো কূটনৈতিক ওজন থাকে না।
সবচেয়ে মারাত্মক কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। দুর্নীতি শুধু টাকা চুরি নয়, বরং এটা বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস চুরির সামিল। যে দেশে প্রতিটা সরকার পরিবর্তনে নীতি পরিবর্তন হয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অর্থহীন।
১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় সিঙ্গাপুরের কাছে ছিল না কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ, ছিল না বিশাল জনগোষ্ঠী, কিংবা কৌশলগত গভীরতা। লি কুয়ান ইউ যেটা বুঝেছিলেন, ভৌগোলিক অবস্থানটাকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে সম্পদের দরকার নেই।
মালাক্কা প্রণালীর মুখে অবস্থিত এই দ্বীপকে তিনি পরিণত করলেন বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বন্দরে। আর তাতেই সিঙ্গাপুর হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র, প্রযুক্তি হাব, এবং বিশ্বের যে কোনো বড় করপোরেশনের আঞ্চলিক সদর দফতরের জন্য পছন্দের গন্তব্য।
১৯৮৬ সালের Doi Moi সংস্কার ভিয়েতনামকে পুরোপুরি বদলে দেয়। কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হয়েও তারা বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করে, যা ছিল এক বিরল এবং সাহসী সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাদের সবচেয়ে লাভজনক সিদ্ধান্ত ছিল, মার্কিন-চীন বাণিজ্য দ্বন্দ্বে।
যখন আমেরিকা চীনের উপর শুল্ক বসাতে শুরু করে, ভিয়েতনাম নিজেকে পরিণত করে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রে। Samsung, Intel, Nike-সহ বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড সরে আসে ভিয়েতনামে। এই পরিবর্তনটা কৌশলগতভাবে পরিকল্পিত ছিল। ভিয়েতনাম তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং সস্তা কিন্তু দক্ষ শ্রমশক্তিকে একটা ‘বড় পুঁজি’ হিসেবে রূপান্তরিত করেছে।
১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর রুয়ান্ডা পরিণত হয়েছিল একটি ধ্বংসস্তূপে। পল কাগামে ক্ষমতায় এসে সিদ্ধান্ত নিলেন রুয়ান্ডাকে এমন একটা জায়গায় পরিণত করতে হবে, যা সমগ্র আফ্রিকার মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে।
আজ কিগালি শহর আফ্রিকার সবচেয়ে পরিষ্কার এবং সবচেয়ে প্রযুক্তি-বান্ধব শহরগুলোর একটি। ড্রোন দিয়ে রক্ত এবং ওষুধ পরিবহনের পরীক্ষামূলক কর্মসূচি রুয়ান্ডায় শুরু হয়েছে। আর্সেনাল ফুটবল ক্লাব এবং বার্সেলোনার স্পনসরশিপ নিয়েছে রুয়ান্ডা পর্যটন বোর্ড। ভাবা যায়?
সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম কিংবা রুয়ান্ডার তুলনায় বাংলাদেশের কাছে যা আছে তা কম নয়। বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনগোষ্ঠী, যেখানে মধ্যবয়সী মানুষের গড় বয়স মাত্র ২৭ বছর। এটি একটি বিশাল জনসংখ্যাগত সুযোগ। ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে কৌশলগত অবস্থান, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার মূলত বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সম্পদ। আর তৈরি পোশাক শিল্পে যে অভিজ্ঞতা গড়ে উঠেছে, সেটা একটা ভিত্তি।
কিন্তু সমস্যাটা হলো, এই শক্তিগুলো এখনও বিচ্ছিন্ন, কোনো সামগ্রিক কৌশলের সাথে যুক্ত নয়। জনশক্তি রপ্তানি হয় কিন্তু দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ নেই। পোশাক রপ্তানি হয় কিন্তু ব্র্যান্ড তৈরি হয় না। অবস্থান আছে কিন্তু সংযোগ অবকাঠামো নেই। আর এসব কারণেই বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে।
সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, রুয়ান্ডার মিল খুঁজলে একটাই জিনিস পাওয়া যায়। প্রতিটা দেশ নিজের জন্য একটি স্পষ্ট এবং অনন্য পরিচয় তৈরি করেছে। ‘আমরা কে’ এই প্রশ্নের একটা নির্দিষ্ট উত্তর আছে তাদের কাছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই পথটা হতে পারে বঙ্গোপসাগর, দেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার।
তবে ভারত, মিয়ানমার, এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ বিন্দু হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিরতা এবং শাসন সংস্কার, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করবে। পোশাক শিল্পের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তি এবং পরিষেবা খাতে বিনিয়োগ এবং নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্পদের অভাব নয়, এটি মূলত পরিচয়ের অভাব। আমরা কী হতে চাই, তা এখনও বলা হয়নি, ঠিক করা হয়নি। বাংলাদেশ কখনো উন্নত দেশের তালিকায় উঠতে পারবে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আমাদের সিদ্ধান্তের উপর।
যখন দেশ নিজের জন্য একটা স্পষ্ট ভবিষ্যত বেছে নেবে এবং সেই বেছে নেওয়ার পথে অবিচল থাকবে যেকোনো নির্বাচনী বা রাজনীতির চাপ সত্ত্বেও, তখনই আমরা অগ্রগতির পথে পা বাড়াতে সক্ষম হবো।
সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, রুয়ান্ডা প্রমাণ করেছে যে কোন সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়ন করা সম্ভব। তবে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই কঠিন পথে হাঁটতে প্রস্তুত?
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ০১ মার্চ ২০২৬