স্লো ইমপোর্ট কৌশলের বাস্তব উদাহরণ শ্রীলঙ্কা
কাগজে-কলমে রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও, ‘ব্যবহারযোগ্য ডলারের’ সংখ্যার হিসাব থাকে আড়ালে, যা অর্থনীতিবিদ ছাড়া সাধারণের বুঝার বাইরে। এখানেই তৈরি হচ্ছে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’, যার ফলে অর্থনীতিতে এক ‘নীরব টাইম বোমা’ দানা বাঁধছে।
রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ১২:৫৩:৩০ পিএম
শেয়ার করুন:

মাহমুদুল হাসান, ঢাকা
প্রায়ই হয়তো শুনে থাকবেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ফুলেফেঁপে উঠছে, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ রেকর্ড ভেঙেছে! এসব খবর খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রচার-প্রকাশ হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে সরকার যে ‘স্থিতিশীলতার’ গল্প শোনায়, আড়ালের বাস্তবচিত্রটা অনেকটা ফাঁপা দেয়ালের মতো, শুভঙ্করের ফাঁকিও বলতে পারেন।
কাগজে-কলমে রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও, ‘ব্যবহারযোগ্য ডলারের’ সংখ্যার হিসাব থাকে আড়ালে, যা অর্থনীতিবিদ ছাড়া সাধারণের বুঝার বাইরে। এখানেই তৈরি হচ্ছে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’, যার ফলে অর্থনীতিতে এক ‘নীরব টাইম বোমা’ দানা বাঁধছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত যে গ্রস রিজার্ভ ঘোষণা করে, তার বড় অংশই বাস্তবে খরচযোগ্য নয়। কারণ এর ভেতরে রয়েছে সোয়াপ (অন্য দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাময়িকভাবে ধার নেওয়া ডলার), বিভিন্ন দায় ও আমানত। এসব বাদ দিলে যে অর্থ থাকে, সেটাই ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ অর্থাৎ বিপদের সময় হাতে থাকা আসল ডলার।
আর এই ফাঁকটা ঢাকতেই গত দুই বছরের অর্থনীতি চালানো হয়েছে নীরব সংকোচনের মধ্য দিয়ে—যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্লো ইমপোর্ট কৌশল’। প্রশ্ন হলো, এই কৌশল কি অর্থনীতিকে বাঁচাতে পারছে, নাকি অনিবার্য বিপর্যয়কে সাময়িকভাবে জিইয়ে রাখছে?
২০২২-২৩ অর্থবছরের শেষে (জুন ২০২৩) বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গ্রস রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩১.২০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতিতে (আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী রিজার্ভ হিসাব) এই অঙ্ক নেমে আসে ২৪.৭৫ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে রিজার্ভ ভালো দেখালেও, ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ তখনই চাপে পড়েছিল।
এই চাপ সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজারে রেকর্ড পরিমাণ ১৩.৫৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল। সহজ করে বললে, রিজার্ভ বাঁচাতে গিয়ে রিজার্ভই খরচ করা হয়েছিল। এতেই বুঝা যায়, সংকট তখনই গভীরে ছিল। এরপর সরকার যে পথ বেছে নেয়, সেটার নাম দেওয়া হয় ‘স্লো ইমপোর্ট কৌশল’। বাস্তবে যেটি ইচ্ছাকৃতভাবে আমদানি সংকোচন বা ইমপোর্ট কম্প্রেশন। উদ্দেশ্য একটাই—ডলার যেন বাইরে কম যায়, রিজার্ভের সংখ্যা যেন ফুলেফেঁপে থাকে, ভালো দেখায়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ৬৯.৫০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৬৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ দুই বছরে আমদানি ব্যয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার কমানো হয়েছে। কিন্তু এই কমানো কোনো দক্ষতা বা উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ফল নয়। এটা হয়েছে এলসি সীমিত করা, ডলার রেশনিং এবং কড়াকড়ির মাধ্যমে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ শিল্প কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির জন্য আমদানিনির্ভর। এসব কাঁচামালকে বলা হয় ইন্টারমিডিয়েট ইনপুট (উৎপাদনের মধ্যবর্তী উপকরণ) এবং ক্যাপিটাল গুডস (যন্ত্রপাতি, মেশিন)। আমদানি কমে যাওয়ায় কারখানাগুলো পর্যাপ্ত কাঁচামাল পাচ্ছে না। তাই উৎপাদন কমছে। সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ছে। এর ফল হচ্ছে কম উৎপাদন, কম কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের বিপুল ক্ষতি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে এসে সরকার আবার রিজার্ভের উন্নতির কথা বলছে। জুন ২০২৫ নাগাদ গ্রস রিজার্ভ দেখানো হচ্ছে প্রায় ৩১.৫–৩১.৭ বিলিয়ন ডলার, বিপিএম৬ হিসেবে প্রায় ২৬.৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, দায় ও কমিটমেন্ট বাদ দিলে প্রকৃত নেট রিজার্ভ তখনও প্রায় ২০–২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি নয়। অর্থাৎ দৃশ্যত স্থিতিশীলতা থাকলেও ভেতরে চাপ থেকেই যাচ্ছে।
স্লো ইমপোর্ট কৌশল: স্বস্তি না সর্বনাশ?
স্বল্পমেয়াদে স্লো ইমপোর্ট কৌশলের একটি সুবিধা আছে। ডলার দ্রুত বেরিয়ে যায় না, বাজারে আতঙ্ক কিছুটা কমে, এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সামনে রিজার্ভের পরিমাণ বেশি দেখানো যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল অর্থনীতির জন্য বেশ ক্ষতিকর।
কারণ আমদানি কমানো মানে শুধু বিলাসপণ্য কমানো নয়। বাংলাদেশে শিল্প উৎপাদনের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আটকে গেলে উৎপাদন কমে যায়, ফলে রপ্তানিও কমে। অর্থাৎ আজ ডলার বাঁচাতে গিয়ে আগামী দিনের ডলার আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
স্লো ইমপোর্ট কৌশলের বাস্তব উদাহরণ শ্রীলঙ্কা। ডলার সংকটে পড়ে দেশটি আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। এমনকি কিছু পণ্যে শতভাগ নগদ জামানত বাধ্যতামূলক করেছিল। ফলাফল ছিল ভয়াবহ। শিল্প উৎপাদন ভেঙে পড়ে।
পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। শ্রীলঙ্কার এই অভিজ্ঞতা দেখায়, আমদানি সংকোচন সংকটের সমাধান নয়, বরং সংকটকে গভীর করে তোলে। তাই সময় থাকতে আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।
এক খাতের নির্ভরতা: তৈরি হচ্ছে নীরব টাইম বোমা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি উৎস হচ্ছে—রেমিট্যান্স (প্রবাসীদের পাঠানো টাকা) এবং রপ্তানি। কিন্তু রপ্তানির ভেতরে ভয়াবহ মাত্রার রপ্তানি কেন্দ্রীকরণ রয়েছে। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১–৮২ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৬.৪ বিলিয়ন ডলার, এর মধ্যে আরএমজি ছিল ৩৮ বিলিয়নের বেশি। ২০২৪-২৫ সালেও এই অনুপাত প্রায় একই রয়ে গেছে। অর্থাৎ দুই বছরে রপ্তানিতে কোনো বৈচিত্র্য বাড়েনি, নির্ভরতাই যেন আরও স্থায়ী হয়েছে।
এক খাতে নির্ভরতার ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুতর। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক উত্তেজনার মতো গ্লোবাল ডিমান্ড শক বা জিওপলিটিকাল শক হলে তৈরি পোশাকের অর্ডার এক ধাক্কায় তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট, শ্রম অস্থিরতা বা আমদানি-রপ্তানির বাধার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে পুরো বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাবে।
একটি খাত ধাক্কা খেলেই রিজার্ভ, বিনিময় হার এবং আমদানি সক্ষমতা একসঙ্গে চাপের মুখে পড়বে। তখন ‘স্লো ইমপোর্ট’ আর কৌশল হিসেবে থাকবে না, হয়ে যাবে বাধ্যতামূলক সংকোচন। আর তখনই বাড়বে ঝুঁকি, ধ্বসে পড়বে অর্থনীতির চাকা।
সমাধান কোথায়?
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রথম কাজ হলো স্লো ইমপোর্ট কৌশলকে স্থায়ী নীতি বানানো থেকে সরে আসা। জরুরি কাঁচামাল ও উৎপাদন ইনপুটের আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রিজার্ভ রিপোর্টিংয়ে স্বচ্ছ তা আনবে হবে।
গ্রস রিজার্ভ নয়, ব্যবহারযোগ্য নেট রিজার্ভ নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। তৃতীয়, বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে আটকে না রেখে ধীরে বাজারের বাস্তবতার কাছাকাছি আনবে হবে। না হলে হুন্ডি (অবৈধ ডলার লেনদেন) বাড়বে এবং রেমিট্যান্স বৈধ চ্যানেল এড়িয়ে যাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রপ্তানি বৈচিত্র্য। তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আইটি ও সেবা খাত, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো খাতগুলোকে বাস্তবিক ও কার্যকর সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনবে হবে।