সমুদ্র জয়ের দশক পার
২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং পরের বছর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের অধীনে আনতে সক্ষম হয়। এই অর্জনকে দেশজুড়ে ‘সমুদ্র জয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।
শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০৮:২২:২৯ পিএম
শেয়ার করুন:

রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা
মূল্যবান ধাতু, সামুদ্রিক প্রাণী ও মৎস্য সম্পদ আহরণের দিক থেকে সমুদ্র অর্থনীতি প্রাচীনতম এক ভাণ্ডার। সামুদ্রিক বাণিজ্য সভ্যতার অগ্রগতির পথ রচনা করেছে। এই সমুদ্র অর্থনীতি বদলে দিতে পারে বাংলাদেশকে।
সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জিডিপিতে ৩ শতাংশ অবদান রাখতে পারে ব্লু-ইকোনমি। প্রবৃদ্ধি ছাড়াতে পারে ১০ শতাংশ। জ্বালানিসম্পদ, মাছ ও লবণে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি পর্যটন ঘিরে হতে পারে বহু কর্মসংস্থান।
২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং পরের বছর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের অধীনে আনতে সক্ষম হয়। এই অর্জনকে দেশজুড়ে ‘সমুদ্র জয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।
বিশাল এই সমুদ্রসীমার অধিকার অর্জন দেশকে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর দরজা খুলে দিয়েছিল—যেখানে মৎস্য সম্পদ, তেল-গ্যাস, খনিজ পদার্থ, সামুদ্রিক শৈবাল, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং পর্যটনের সম্ভাবনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও এই সম্ভাবনাকে অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটন চলমান রয়েছে। তবে সম্ভাবনা কাজে লাগানো হচ্ছে কম। ফলে এ খাতে দেশের আয়ের পরিমাণও কম। তাই পর্যটন স্পটগুলোর উন্নয়ন দরকার। পর্যটন এলাকায় আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক সুকৃতির প্রতিফলন থাকা উচিত।
আমাদের বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় রয়েছে বিপুল পরিমাণে ভারী খনিজ, ২২০ প্রজাতির সাগর-উদ্ভিদ, ৩৪৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪৯৮ প্রজাতির ঝিনুক, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৬১ প্রজাতির সি-গ্রাস। এসব জৈব-অজৈব সম্পদ সাগর- অর্থনীতিতে তরঙ্গ তৈরি করতে পারবে।
সমুদ্রতলের গ্যাস, মৎস্যসহ অন্যান্য সম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটনের ক্ষেত্রে যথোচিত কার্যক্রম সম্পন্ন হলে ২০৩০ সাল নাগাদ সমুদ্র থেকে প্রতি বছর আড়াই লাখ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব। কিন্তু এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে রয়েছে বহু প্রতিবন্ধকতা। এখানে অভাব আছে পর্যাপ্ত নীতিমালা ও সঠিক কর্মপরিকল্পনার।
সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনায় দেশের পিছিয়ে থাকার পেছনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ কাজ করছে। সমুদ্রের তলদেশে কী ধরনের সম্পদ আছে, তার সঠিক চিত্র এখনও অনিশ্চিত।
আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার অভাবের কারণে তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদের কার্যকর অনুসন্ধান সম্ভব হয়নি। এসব কারণেই বেসরকারি খাত বিনিয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত। পাশাপাশি সমুদ্র নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে অবৈধভাবে মাছ ধরা, জলদস্যুতা ও মানব পাচার নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।
একটি কার্যকর ব্লু ইকোনমি নীতি না থাকায় সম্ভাবনার হাতছানিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সমন্বয়, এবং গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের কাঠামো আজও অপর্যাপ্ত।
মানবসম্পদ, বিশেষ করে সমুদ্র বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে দক্ষ পেশাজীবীর অভাবও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রণোদনা ও নীতিমালা না থাকায় বিদেশি অংশগ্রহণও সীমিত হয়ে আছে।
সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান এখানে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশাল মৎস্য সম্পদ, নতুন তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্র, মূল্যবান খনিজ পদার্থ, সামুদ্রিক শৈবাল ও ফার্মাসিউটিক্যালস, নবায়নযোগ্য শক্তি, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক মানের বন্দর—সবই সম্ভাবনার অংশ। কিন্তু এই সম্ভাবনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই কার্যকর উন্নয়ন হয়নি।
মৎস্য সম্পদের অনেক অংশ অনাহরিত বা অবৈধভাবে আহৃত হচ্ছে। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে সাফল্য সীমিত। খনিজ সম্পদের সঠিক অবস্থানও অজানা। এবং পর্যটন ও বন্দর ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মানদন্ডে পৌছানোও সম্ভব হয়নি। সমুদ্র থেকে নবায়নযোগ্য শক্তি আহরণে বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের সমুদ্র জয় আজও বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারেনি। এই জয়কে অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে হলে গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং নীতিমালার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সমুদ্র সম্পদের বৈজ্ঞানিক জরিপ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে, এই ঐতিহাসিক অর্জন কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
একদিকে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা, অন্যদিকে কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাব। এই অদ্ভুত পরিহাসের সমাধান একটাই—দ্রুত এবং সমন্বিত ব্লু ইকোনমি নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
২০১২ সালের ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে মামলায় বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকার অধিকার পায়। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমার প্রায় ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের অধিকার পায় বাংলাদেশ।
এর পরই সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও গবেষণায় সরকার নানা উদ্যোগ নেয়। সমুদ্রসীমা অর্জনের পরের বছরই ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সমুদ্রসম্পদ আহরণ এবং এর যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়।
২০১৫ সালে সমুদ্রসম্পদ গবেষণায় প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট। ২০১৭ সালে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠন করা হয় ‘ব্লু ইকোনমি সেল’।
২০১৮ সালে নৌবাহিনী সদর দপ্তরের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিমরাড) নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বদ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেল্টা প্ল্যানে সমুদ্র অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এ পরিকল্পনায় নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাঁচ ধরনের কৌশল ঠিক করা হয়েছে, যার অন্যতম হলো সমুদ্রসম্পদের বহুমাত্রিক জরিপ দ্রুত সম্পন্ন করা। গত ১০ বছরে সমুদ্রসম্পদ নিয়ে কিছু গবেষণা হয়েছে। এর বাইরে সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ছাড়া সম্পদ আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস রয়েছে। এখানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলে তা দেশের জন্য ব্লু ইকোনমির একটি বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
তেল-গ্যাস ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে সালফার, মেটালিক মডিউল, কোবাল্ট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট বা মিথেন গ্যাসের জমাট স্তরের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার একান্ত অর্থনৈতিক এলাকায় ০.১১ থেকে ০.৬৩ ট্রিলিয়ন কিউসিক ফুট সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেট থাকার বিষয়টি অনুমিত হয়েছে, যা ১৭ থেকে ১০৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের সমপরিমাণ।
দেশের স্থলভাগে মজুত প্রাকৃতিক গ্যাস শেষ হওয়ার পথে। সাগরে গ্যাস পেলে দেশের অগ্রগতির চাকা আরও বেগবান হবে। ব্লু ইকোনমির কল্যাণে বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে, এমনটি আশা করা হচ্ছে ব্যাপকভাবে। বাংলাদেশকে এ খাতে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে এক্ষেত্রে সফল দেশগুলোকে অনুসরণ করতে হবে।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬