রমজানের বাজার-সদাই
মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে রমজান এলেই নিত্যপণ্যের বাজারে রীতিমতো উৎসবের আমেজ তৈরি হয়; দেওয়া হয় বিশাল মূল্যছাড়, বিশেষ অফার ও সরকারি ভর্তুকি। অথচ বাংলাদেশে রোজা শুরুর সপ্তাহখানেক আগে থেকেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলার দাম যেন জাদুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।
রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০৩:৫৯:২১ পিএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ রাফসান জনি, ঢাকা
রমজান মানেই সংযম, আত্মশুদ্ধি আর ভ্রাতৃত্ববোধের গভীর দর্শন। অন্তত ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এ কথাই ধ্রুবসত্য। কিন্তু বাংলাদেশে এই পবিত্র মাসের আগমনের সুর বাজারদর দিয়ে মাপতে গেলে দেখা যায়, এক সম্পূর্ণ ভিন্ন, নির্মম ও অস্বস্তিকর গল্প।
মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে রমজান এলেই নিত্যপণ্যের বাজারে রীতিমতো উৎসবের আমেজ তৈরি হয়; দেওয়া হয় বিশাল মূল্যছাড়, বিশেষ অফার ও সরকারি ভর্তুকি। অথচ বাংলাদেশে রোজা শুরুর সপ্তাহখানেক আগে থেকেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলার দাম যেন জাদুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।
প্রশ্নটা বহু পুরোনো, কিন্তু উত্তরটা আজও অস্বস্তিকর। অন্য দেশে রোজার মাসে জিনিসের দাম কমে, আর আমাদের দেশে বাড়ে কেন?
রমজান যেখানে সামাজিক দায়বদ্ধতা
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে তাকালে অবাক হতে হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার কিংবা কুয়েতে রমজানকে শুধু একটি ধর্মীয় মাস হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি তাদের কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের শ্রেষ্ঠ সময়। রোজা শুরুর আগেই সেখানকার বড় বড় সুপারমার্কেটগুলো শত শত নিত্যপণ্যে বিশেষ মূল্যছাড় ঘোষণা করে।
অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক কম লাভে, এমনকি কখনও কখনও একেবারে ক্রয়মূল্যেই পণ্য বিক্রি করেন বিক্রেতারা। সেখানকার বড় আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতারা এই ছাড় দেওয়াকে কোনো লোকসান মনে করেন না।
বরং তারা এটিকে ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’ তৈরি, গ্রাহকের সাথে দীর্ঘমেয়াদী আস্থা অর্জন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের এক চমৎকার সমন্বয় হিসেবে দেখেন। তারা জানেন, তাৎক্ষণিক সর্বোচ্চ মুনাফা না করলেও, রমজানে মানুষের পাশে দাঁড়ালে বছরজুড়ে সেই ক্রেতা তাদেরই থাকবে।
আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ বনাম লোক দেখানো অভিযান
মধ্যপ্রাচ্যের এই বাজার ব্যবস্থাপনার পেছনে ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার পাশাপাশি সরকারি কর্তৃপক্ষের কঠোর ভূমিকা সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। সেখানে রমজানের আগে থেকেই বাজার বিশ্লেষণ, আমদানি পরিকল্পনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা একেবারে নিশ্ছিদ্র করা হয়।
নির্দিষ্ট কিছু নিত্যপণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সরকার থেকে কঠোরভাবে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর চলে নিয়মিত ও নির্দয় বাজার মনিটরিং। কৃত্রিম সংকট তৈরি বা মজুতদারির বিন্দুমাত্র প্রমাণ মিললে লাইসেন্স বাতিল, বড় অঙ্কের জরিমানা, এমনকি সরাসরি কারাদণ্ডের মতো শাস্তি কার্যকর করা হয়। সেখানে আইনের উপস্থিতি কেবল কাগজে নয়, মাঠে দৃশ্যমান।
উল্টো চিত্র বাংলাদেশে!
রমজান ঘনিয়ে এলেই আমাদের দেশের বাজারে এক ধরনের ‘অদৃশ্য অস্থিরতা’ তৈরি হয়। পাইকারি পর্যায়ে হঠাৎ করেই দাম বাড়ার গুঞ্জন ওঠে, আর খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন ঘটে বিদ্যুতবেগে। সরকার বাজার তদারকির উদ্যোগ নেয় ঠিকই; ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা হয়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীকে জরিমানাও করা হয়।
কিন্তু সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপগুলো মোটেও ধারাবাহিক নয়। গুটিকয়েক প্রভাবশালী আমদানিকারক ও বাজার নিয়ন্ত্রণকারী ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙার মতো কোনো কাঠামোগত শক্তি বা সদিচ্ছা এসব অভিযানে দেখা যায় না। ফলে, ম্যাজিস্ট্রেট বাজার থেকে বের হওয়ার আধঘণ্টা পরই পণ্য আবার আগের চড়া দামেই বিক্রি হতে থাকে।
সরবরাহ শৃঙ্খল: পূর্বপ্রস্তুতি ও কৃত্রিম সংকট
এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ‘কৃত্রিম সংকট’। মধ্যপ্রাচ্যে সবাই জানে রমজানে চাহিদা বাড়বে। তাই আগে থেকেই পর্যাপ্ত আমদানি ও কোল্ড স্টোরেজগুলোতে মজুত নিশ্চিত করা হয়। তাদের লজিস্টিক নেটওয়ার্ক থাকে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু আমাদের দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কেন হাহাকার ওঠে?
অনুসন্ধানে উঠে আসে, বাংলাদেশে পাইকারি পর্যায়ে পণ্য আটকে রেখে বাজারে সরবরাহ কম দেখানো হয়। গুদামে লাখ লাখ টন চিনি বা তেল পড়ে থাকলেও, বাজারে ছড়ানো হয় সংকটের গুজব। এরপর সরবরাহ-চাহিদার স্বাভাবিক সমীকরণকে বিকৃত করে, সেই আটকে রাখা পণ্যই ছাড়া হয় দ্বিগুণ দামে।
প্যানিক বায়িং: ক্রেতা হিসেবে আমাদের দায় কতটা?
তবে কেবল ব্যবসায়ীদের দোষ দিলেই কি ফুরোবে দায়? আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে এদেশের সাধারণ ক্রেতাদেরও। বাংলাদেশে রমজান বা যেকোনো উৎসবের আগে অতিরিক্ত কেনাকাটার এক অদ্ভুত হিড়িক বা ‘প্যানিক বায়িং’ লক্ষ্য করা যায়। এক মাসের বাজার অনেকে এক দিনেই করে ফেলতে চান। একসঙ্গে ২০ কেজি চাল, ১০ লিটার তেল, ৫ কেজি চিনি কিনে মজুত করেন।
মুহূর্তের মাঝে বাজারে এই আকস্মিক ও অস্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগটাই লুফে নেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সুশৃঙ্খল সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে সেখানকার ভোক্তাদের মধ্যে এমন কোনো আতঙ্ক তৈরি হয় না। তারা জানেন, মাসের শেষ দিনটিতেও বাজারে গেলে একই দামে পণ্য পাওয়া যাবে।
অতি মুনাফার মৌসুম ও নৈতিকতার স্খলন
আমাদের অনেক পণ্যই আমদানিনির্ভর, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দেশে প্রভাব পড়বে—এটা সত্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার যখন পুরোপুরি স্থিতিশীল থাকে, তখনও রমজান এলেই কেন দাম বাড়ে? অর্থনীতিবিদদের মতে, এর মূল কারণ দেশের প্রতিযোগিতাহীন বাজার ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক নৈতিকতার চরম অবক্ষয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বহু ব্যবসায়ী যেখানে রমজানকে ইফতার প্যাকেজ বিতরণ বা ফ্রি পণ্য দেওয়ার মাস হিসেবে দেখেন, সেখানে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ রমজানকে দেখেন ‘বাড়তি মুনাফার মৌসুম’ হিসেবে। সংযমের মাসটি পরিণত হয় গলাকাটা বাণিজ্যের মাসে।
সমাধান কোন পথে?
সমস্যাগুলো পাহাড়সম হলেও, এর সমাধান অসম্ভব নয়। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছার। কঠোর ও ধারাবাহিক বাজার তদারকি, সরবরাহ শৃঙ্খলে শতভাগ স্বচ্ছতা, সিন্ডিকেটবিরোধী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি ভোক্তা হিসেবে আমাদের কেনাকাটায় সংযমী হওয়া—এই চারটির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই পরিবর্তন সম্ভব।
রমজান সংযমের মাস। সেই সংযম যদি কেবল সাধারণ মানুষের ডাইনিং টেবিল বা প্লেটেই সীমাবদ্ধ থাকে, আর বাজারের আড়তে গিয়ে হারিয়ে যায়, তবে এই বৈষম্য কখনোই ঘুচবে না।
বাজারের চরিত্র বদলাতে যেমন কঠোর আইন প্রয়োগ দরকার, তেমনি দরকার ব্যবসায়িক মানসিকতার আমূল পরিবর্তন। তা না হলে, প্রতি বছর রমজান আসবে, ‘অন্য দেশে দাম কমে আমাদের বাড়ে কেন’—এই পুরোনো প্রশ্নটি ঘুরপাক খাবে, আর অসহায় ক্রেতারা কেবল দীর্ঘশ্বাসই ফেলবেন।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬