বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৭:৩২ এএম
শেয়ার করুন:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও আলোচনার আগুনে ঘি ঢেলেছেন। তাঁর দাবি—গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসা উচিত। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, জাতীয় নিরাপত্তা। কিন্তু এই দাবি সোজাসাপ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে গ্রিনল্যান্ডের নেতৃত্ব এবং ডেনমার্ক—যার অধীনে আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে গ্রিনল্যান্ড পরিচালিত হয়।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের ঠিক পরদিন, যে অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়, ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে আবার গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ তোলেন।
তিনি বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। এটা ভীষণ কৌশলগত জায়গা। এখন গ্রিনল্যান্ড জুড়ে রাশিয়া আর চীনের জাহাজ ঘোরাফেরা করছে।”
এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন। তাঁর সাফ কথা—“এবার যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের ভাবনা নিছক কল্পনা।”
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ডেনিশ রাজ্যের তিনটি দেশের একটিকেও যুক্তরাষ্ট্র দখল করতে পারে না। তাদের কোনো অধিকার নেই।”
পুরোনো স্বপ্ন, নতুন হুমকি
এটা প্রথম নয়। ২০১৯ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ‘কিনে নেওয়ার’ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জবাব এসেছিল, এটা বিক্রির জন্য নয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর তিনি সেই আগ্রহ নতুন করে জাগান। এমনকি বলেও দেন—প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের পথও খোলা।
ডেনমার্ক, যা ন্যাটোর মিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এই অবস্থানে রীতিমতো হতভম্ব। বিবিসির কূটনৈতিক প্রতিবেদক জেমস ল্যান্ডেলের ভাষায়, ওয়াশিংটন-কোপেনহেগেন সম্পর্কে এ এক বড় ধাক্কা।
এর মধ্যেই বিতর্ক বাড়ায় উচ্চপর্যায়ের মার্কিন সফর। মার্চে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ডে গিয়ে প্রকাশ্যে ডেনমার্ককে অভিযুক্ত করেন, দ্বীপটির প্রতিরক্ষায় যথেষ্ট বিনিয়োগ না করার জন্য।
২০২৫ সালের শেষ দিকে উত্তেজনা আরও বাড়ে, যখন ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের জন্য বিশেষ দূত নিয়োগ করেন, জেফ ল্যান্ড্রি। তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা উচিত।
গ্রিনল্যান্ড কোথায়? আর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ—যেটা কোনো মহাদেশ নয়। এটি আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত। জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজারের মতো। অধিকাংশই আদিবাসী ইনুইট জনগোষ্ঠীর মানুষ।
দ্বীপের প্রায় ৮০ শতাংশ বরফে ঢাকা। তাই মানুষের বসবাস মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে, রাজধানী নুকের আশপাশে। অর্থনীতি প্রধানত মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। বড় অঙ্কের ভর্তুকি আসে ডেনমার্ক থেকে।
বরফ গলছে, আগ্রহ বাড়ছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে নজর বেড়েছে। এখানে রয়েছে—বিরল খনিজ, ইউরেনিয়াম ও লোহা। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলছে, আর সেই সঙ্গে এই সম্পদগুলো সহজে পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে।
ট্রাম্প বিশ্বের অন্যত্রও খনিজ সম্পদ নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন—ইউক্রেন তার একটি উদাহরণ। তবে ট্রাম্পের দাবি, “আমরা খনিজের জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড চাই।”
একটি আর্কটিক ইনস্টিটিউটের গবেষণাপত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীন আর্কটিকে সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সেখানে নিজেদের উপস্থিতি আরও জোরদার করা।
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বহু পুরোনো
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, নাৎসি জার্মানি ডেনমার্ক দখল করার পর যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠায়। গড়ে তোলে সামরিক ও রেডিও স্টেশন। যুদ্ধ শেষ হলেও মার্কিন সেনারা থেকে যায়। আজও সেখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত পিটুফিক স্পেস বেস—আগের নাম থুলে এয়ার বেস।
১৯৫১ সালের এক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার দেয়। ডেনিশ প্রতিরক্ষা কলেজের অধ্যাপক মার্ক জ্যাকবসেন বলেন, “রাশিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, সবচেয়ে ছোট পথ হবে উত্তর মেরু ও গ্রিনল্যান্ড হয়ে। তাই পিটুফিক বেস যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।”
গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা: ইতিহাসের পাতায়
ট্রাম্পের আগেও যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করেছে। ১৮৬৭ সালে আলাস্কা কেনার পর, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম এইচ সিউয়ার্ড ডেনমার্কের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড কেনার আলোচনা করেন, ব্যর্থ হন। ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ১০ কোটি ডলার প্রস্তাব দেয় (আজকের মূল্যে প্রায় ১.২ বিলিয়ন বা ১২০ কোটি ডলার)। ডেনমার্ক তাতেও রাজি হয়নি।
ডেনমার্ক কেন গ্রিনল্যান্ড শাসন করে?
ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকার অংশ হলেও, প্রায় ৩০০ বছর ধরে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে। ১৮ শতকে ডেনিশ উপনিবেশ স্থাপনের পর নুকের কাছে নতুন বসতি গড়ে ওঠে। ১৯৫৩ সালে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হয়, আর গ্রিনল্যান্ডবাসী পায় ডেনিশ নাগরিকত্ব।
১৯৭৯ সালের গণভোটে আসে ‘হোম রুল’। অভ্যন্তরীণ বেশিরভাগ নীতির দায়িত্ব যায় গ্রিনল্যান্ডের হাতে। তবে পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা থাকে ডেনমার্কের কাছে।
গ্রিনল্যান্ডবাসী কী চায়?
২০২৬ সালের শুরুতে ট্রাম্পের হুমকির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আর কোনো চাপ নয়। আর কোনো ইঙ্গিত নয়। আর কোনো দখল কল্পনা নয়।” তিনি বলেন, “আমরা আলোচনায় রাজি। কিন্তু সেটা আন্তর্জাতিক আইন ও সম্মানের ভিত্তিতে হতে হবে।”
২০২৫ সালে বিবিসির সাংবাদিক ফারগাল কিন দ্বীপে গিয়ে এক কথাই বারবার শুনেছেন— “গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীর। ট্রাম্প আসতে পারেন, কিন্তু এখানেই শেষ।” জরিপ বলছে, বেশিরভাগ গ্রিনল্যান্ডবাসী ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চায়।
গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন এয়ারবেস
কিন্তু একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার ধারণা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। ২০১৯ সালে ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড কেনার কথা বলেছিলেন, তখন স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র।
একজন পর্যটন উদ্যোক্তা ডিনেস মিকায়েলসেন বলেছিলেন, “এটা ভীষণ বিপজ্জনক ধারণা।”
গ্রিনল্যান্ডের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী আলেকা হ্যামন্ডের কথায়, “তিনি আমাদের এমনভাবে দেখছেন, যেন আমরা কেনাবেচার কোনো পণ্য।”
বরফে ঢাকা এই দ্বীপ তাই আজ শুধু ভূগোল নয়—এটি ক্ষমতা, নিরাপত্তা আর সার্বভৌমত্বের এক উত্তপ্ত প্রতীক। সূত্র: বিবিসি।
নবোদয়/ জেডআরসি/ ০৫ জানুয়ারি ২০২৬