নতুন কূটনৈতিক মেরুকরণে বাংলাদেশ
কৌশলগত বার্তা: ১৪ বছর পর ঢাকা-করাচি ফ্লাইট এবং জেএফ-১৭ ক্রয়ের আলোচনা—দিল্লির 'নিরাপত্তা বলয়' উপেক্ষা করে বিকল্প খোঁজার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
পানির আন্তর্জাতিকীকরণ: দ্বিপাক্ষিক গঙ্গা চুক্তি নবায়নে আগ্রহ নেই ঢাকার, নজর এখন জাতিসংঘের কনভেনশনে—যা ভারতের আঞ্চলিক দাদাগিরির ওপর সরাসরি আঘাত।
চাপের কূটনীতি: নির্বাচনের আগে ভিসা বন্ধ ও ক্রিকেট বয়কট—ভারতের সফট পাওয়ারকে অকার্যকর করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত ছক।
নেতৃত্বের শূন্যতা: খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও হাসিনার প্রস্থান—দুই বেগমের যুগের সমাপ্তিতে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক অনির্দেশ্য ও সংঘাতময় পথে।
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৬:৪৮ এএম
শেয়ার করুন:
আদিত্য আজাদ, ঢাকা
৯ জানুয়ারি, ২০২৬ : বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
আল জাজিরার বিশ্লেষণে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দিল্লির জন্য কেবল অস্বস্তিকর নয়, রীতিমতো সতর্কবার্তা। সংবাদমাধ্যমটি পরিষ্কার করেছে যে, ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর ইসলামাবাদ ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতি’র নামে ঢাকার শূন্যস্থানে ঢুকে পড়েছে।
এতদিন দিল্লি মনে করত ঢাকা তাদের ‘ক্যাপটিভ মার্কেট’, কিন্তু পাকিস্তানের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব সেই ধারণার মূলে আঘাত করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল অস্ত্র বেচাকেনা নয়; এটি ভারতকে জানিয়ে দেওয়া যে, সামরিক প্রয়োজনে ঢাকার সামনে এখন আর কেবল একটিই দরজা খোলা নেই।
চ্যানেল নিউজ এশিয়ার তথ্যানুযায়ী, আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ঢাকা-করাচি রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু হওয়া কেবল যোগাযোগ পুনঃস্থাপন নয়, এটি একটি জিওপলিটিক্যাল করিডোর।
১৪ বছর পর এই রুট চালু এবং পর্দার আড়ালে যুদ্ধবিমান নিয়ে দরকষাকষি প্রমাণ করে, ১৯৭১-এর ‘আবেগ’ এখন ২০২৬-এর ‘বাস্তবতা’র কাছে ম্লান। ঢাকা বুঝিয়ে দিচ্ছে, ভারতের সঙ্গে দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে তারা প্রয়োজনে পুরনো শত্রুর সঙ্গেও হাত মেলাতে প্রস্তুত।
দিল্লির সাউথ ব্লক এই ফ্লাইটকে কেবল যাত্রী পরিবহন হিসেবে দেখছে না, দেখছে তাদের প্রভাববলয় থেকে ঢাকার বেরিয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন নিয়ে দিল্লির গড়িমসির জবাব ঢাকা দিচ্ছে কৌশলে।
১৯৯৬ সালের চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চললেও ঢাকা এবার আর দিল্লির দ্বারে ধরনা দিচ্ছে না। বরং তারা জাতিসংঘের পানি কনভেনশনের দিকে ঝুঁকছে, যা পানির হিস্যা আদায়ের ইস্যুটিকে দ্বিপাক্ষিক থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যাবে।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এমনিতেই সম্পর্কে বিষ ঢেলেছে, তার ওপর পানির এই আন্তর্জাতিকীকরণ ভারতের দীর্ঘদিনের ‘নদী-রাজনীতি’র নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে ঢাকার সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে ‘শত্রুতাপূর্ণ অসহযোগিতা’ হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখা আসলে একটি কূটনৈতিক অবরোধ।
একই সমীকরণে আইপিএল থেকে মুস্তাফিজের বাদ পড়া এবং বিসিবির বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি—এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঢাকা এখন ভারতের সফট পাওয়ার (ক্রিকেট ও বলিউড) ব্যবহার করেই উল্টো দিল্লিকে চাপে রাখছে। বার্তাটি পরিষ্কার: স্বাভাবিক সম্পর্ক চাইলে দিল্লিকে ঢাকার শর্ত মানতে হবে।
লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান খালেদা জিয়ার প্রয়াণ নিয়ে যে বিশ্লেষণ দিয়েছে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত। পত্রিকাটি বলছে, শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ‘ব্যাটল অব দ্য বেগমস’-এর পরিচিত ছক ভেঙে চুরমার।
এতদিন রাজনীতি ছিল দুই নেত্রীর ব্যক্তিগত দ্বৈরথকেন্দ্রিক, যা একধরণের অনুমানযোগ্যতা তৈরি করত। এখন সেই ব্যাটন নেই। নেতৃত্বের এই বিশাল শূন্যতায় নতুন কারা উঠে আসবে এবং তারা কতটা ভারত-বিদ্বেষী বা পাকিস্তান-ঘেঁষা হবে, তা পশ্চিমা বিশ্বের জন্যও উদ্বেগের।
সবশেষে, পরিস্থিতির নির্মম সত্য হলো—বাংলাদেশ এখন আর ‘ভারসাম্য’ রক্ষা করছে না, বরং সক্রিয়ভাবে পক্ষ বদল করছে। ভারতের ছায়া থেকে বের হতে গিয়ে ঢাকা কি তবে পাকিস্তানের মতো এক অস্থিতিশীল মিত্রের ওপর বাজি ধরছে?
জেএফ-১৭ আর করাচির ফ্লাইট হয়তো দিল্লির ইগোতে আঘাত করবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই ‘পাকিস্তান পিভট’ বা উলটপুরাণ ঢাকার সার্বভৌমত্বকে নতুন কোনো বিদেশি শক্তির দাবার গুটিতে পরিণত করবে কি না—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
নবোদয়/ এএ/ জেডআরসি/ ০৯ জানুয়ারি ২০২৬