দিল্লিকে ‘না’, ইসলামাবাদকে ‘হ্যাঁ’
>> নতুন দাবার চালে বাংলাদেশ
>> ‘ভারত-নির্ভরতা’ ঝেড়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’
>> পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান কিনবে বাংলাদেশ
বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৫৭:৩৪ এএম
শেয়ার করুন:
আদিত্য আজাদ, ঢাকা
৮ জানুয়ারি, ২০২৬ : বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
ক্রিকেটের ভেন্যু পরিবর্তন এখন আর নিছক লজিস্টিকস বা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি ঢাকার পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির এক স্পষ্ট মহড়া। ২০২৬-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে আইসিসির কাছে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবটি আপাতদৃষ্টিতে খেলোয়াড়দের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ মনে হলেও, এর পেছনের বার্তাটি তীক্ষ্ণ ও রাজনৈতিক।
রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিবির এই অনড় অবস্থান মূলত সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ রাজনৈতিক উত্তেজনারই সরাসরি প্রতিফলন। যেখানে ‘জাতীয় মর্যাদা’র প্রশ্ন তুলে প্রতিবেশি দেশের আতিথেয়তা বর্জন করা হচ্ছে, সেখানে খেলার মাঠটি এখন কূটনৈতিক দরকষাকষির টেবিলে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, টাইমিং এবং বৈপরীত্য। যেই মুহূর্তে ভারতের আকাশসীমা বা মাটি বাংলাদেশের জন্য 'ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই আরেক পুরনো ‘বন্ধু’ পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের জট খুলছে অভাবনীয় দ্রুততায়।
রয়টার্স নিশ্চিত করেছে যে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমান বাহিনী প্রধানরা সম্প্রতি বৈঠক করেছেন, যেখানে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয় এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এক সীমান্তে যখন দূরত্বের দেয়াল তোলা হচ্ছে, অন্য সীমান্তে তখন যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিনের শব্দে নতুন সখ্যতার বার্তা। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এক দুয়ার বন্ধ করে অন্য দুয়ার খোলার এই কৌশল কাকতালীয় হতে পারে না।
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১ সালের পর থেকে ঢাকার সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্ক সবসময়ই ছিল অস্বস্তিকর ও শীতল, যেখানে দিল্লি ছিল বিশ্বস্ত মিত্র। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সেই সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক বা সীমান্ত উত্তেজনা—এগুলো হয়তো উপলক্ষ মাত্র।
আসল ঘটনা হলো, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের ‘ভারত-নির্ভরতা’ ঝেড়ে ফেলে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ার এক ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সচেতন বার্তা দিচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগে এই ১৮০ ডিগ্রি বাঁক বদল বুঝিয়ে দেয়, পররাষ্ট্রনীতি এখন আর আবেগের বশে নয়, বরং কঠোর স্বার্থের গাণিতিক হিসাবে পরিচালিত হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই জোড়া পদক্ষেপ—ভারত বর্জন এবং পাকিস্তান ঘেঁষা নীতি—নিঃসন্দেহে একটি সুপরিকল্পিত নির্বাচনী কৌশল। ‘সার্বভৌমত্ব’ ও ‘জাতীয় মর্যাদা’র আবেগকে উসকে দিয়ে ভোট ব্যাংকে জোয়ার আনার এটি এক পরীক্ষিত পদ্ধতি। বিসিবি যখন নিরাপত্তার কথা বলে, তখন তারা মূলত সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করছে।
সাধারণ জনমনে ভারতবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে এবং পাকিস্তানের সাথে সামরিক সখ্যতাকে ‘নতুন দিনের সূচনা’ হিসেবে উপস্থাপন করে সরকার নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। এখানে ক্রিকেট বা যুদ্ধবিমান মুখ্য নয়, মুখ্য হলো ভোটের আগে জাতীয়তাবাদের কড়া ডোজ।
আইসিসি শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরাবে কিনা, তা এখন গৌণ বিষয়। আসল সত্য হলো, ঢাকা তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনের আগে এই ‘অ্যান্টি-ইন্ডিয়া সেন্টিমেন্ট’ হয়তো সরকারের জনপ্রিয়তার গ্রাফ সাময়িকভাবে ঊর্ধ্বমুখী করবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনীতিতে এটি বাংলাদেশকে এক পিচ্ছিল পথে দাঁড় করিয়ে দিল। এখন আর দেখার বিষয় কিছু নেই; ঢাকা তার ঘুঁটি চেলে দিয়েছে—এটা এখন আর শুধুই নিরাপত্তা শঙ্কা নয়, এটি পুরোদস্তুর ক্ষমতার দাবার চাল।
নবোদয়/ এএ/ জেডআরসি/ ০৮ জানুয়ারি ২০২৬