➤ ইংরেজি আর মিশ্র ভাষার দাপটে কোণঠাসা মাতৃভাষা
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া এই বাংলাদেশে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্রভাষা বাংলা আজও নিজ ভূমিতে পরবাসীর মতো।
শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । ০১:০৪:২১ এএম
শেয়ার করুন:

জুবায়ের রহমান চৌধুরী, ঢাকা
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তা ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও পুরোপুরিভাবে সেই নির্দেশনাটি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া এই বাংলাদেশে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্রভাষা বাংলা আজও নিজ ভূমিতে পরবাসীর মতো।
সাইনবোর্ড, বিল বোর্ড, গাড়ির নম্বর প্লেট থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনে ইংরেজি আর মিশ্র ভাষার দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। আদালতের কড়া হুঁশিয়ারি আর নির্দেশনা জারির পরও প্রশাসনের উদাসীনতায় ভাষা দূষণ ও অবজ্ঞা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার ও ভাষার বিকৃতি বা অপব্যবহার বন্ধে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এক রিটের (রিট পিটিশন-১৬৯৬/২০১৪) শুনানি নিয়ে বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে সেসব নির্দেশনা আজও উপেক্ষিত রয়েছে।
এ বিষয়ে আদেশে আদালত তখন বলেছিলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের ভাষা বাংলা হিসাবে সুস্পষ্টভাবে সন্নিবেশিত এবং বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ প্রবর্তন হয়, তথাপিও স্বাধীনতার ৪২ বছর ও আইনটি প্রবর্তনের ২৬ বছর পরও বাংলা ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাংলা ভাষা ব্যবহারের তেমন কোন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না, উপরন্তু নিস্ক্রিয়তা ও বিজাতীয় ভাষা ব্যবহারের প্রতি অতীব আগ্রহ লক্ষণীয়।
আদেশে আদালত উল্লেখ করেন, ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতির সচিবালয়, গণভবন এর সংখ্যা ৩০/১২/৭৫, সাধারণ-৭২৯/১ (৪০০) এর মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষা প্রচলন সংক্রান্ত প্রথম সরকারি (আদেশ পত্র, ১৯৭৫) আদেশ জারি করেন।
এরপর ১৯৭৯ সালের ১২ জানুয়ারি মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৭৮ এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাষা প্রচলন সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশ জারি করা হয়।
আদালত বলেন, কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় এই যে, অদ্যাবদি বাংলা ভাষা প্রচলনের ক্ষেত্রে সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোনো আশানুরুপ পদক্ষেপ গ্রহণ তো দূরে থাক, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিজাতীয় ভাষাকে প্রাধান্য ও উপযাজক হয়ে ব্যবহার ও পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি লক্ষণীয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাংলার পরিবর্তে বিজাতীয় ভাষার ব্যবহার ও শিক্ষাদানের জন্য অতীব আগ্রহী কিছু মানুষের পৃষ্ঠপোষকতা লক্ষণীয়। যা বাংলা ভাষাভাষী ও বাঙালির জন্য মোটেও মঙ্গলজনক নয়, বরং ইহা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও বাংলাভাষার প্রতি অবজ্ঞারই প্রতিফলন।
আদেশে আদালত আরও বলেন, যেহেতু, বাংলা ভাষা এই দেশের অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা, সংবিধানেও বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃত এবং ২১ শে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত, এবং জনমনে নিজ ভাষার সর্বত্র ও সর্বক্ষেত্রে ব্যবহারের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা পরিলক্ষিত হয় এবং বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ এবং বিভিন্ন সময় বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জারিকৃত অধ্যাদেশ অদ্যাবদি বিদ্যমান।
তাই দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রচলনের উদ্দেশ্যে অনতিবিলম্বে কেন সম্যক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না মর্মে, মন্ত্রী পরিষদ সচিব, আইন ও সংসদ বিষয়ক সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, ধর্ম ও সংস্কৃতি সচিব, তথ্য সচিব, শিক্ষা সচিবের ওপর রুল জারি করা হয়। পরে এ বিষয়ে আর কোনো আদেশ হয়নি।
এ বিষয়ে রিটকারীদের একজন আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ বলেন, ‘‘সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার ও ভাষার বিকৃতি বন্ধে হাইকোর্ট একগুচ্ছ নির্দেশনা দিলেও আজও সেসব নির্দেশনার কোনো বাস্তবায়ন নেই। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকার যথাযথ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।’’
বাংলা ভাষার ব্যবহার ও ভাষার বিকৃতি বন্ধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষকেও আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ।
এ ছাড়া ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রেডিও ও টিভিতে বাংলা ভাষাকে ব্যঙ্গ করে বা বিকৃত উচ্চারণে প্রচার না করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি দৈনিক পত্রিকায় ‘ভাষাদুষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শিরোনামের নিবন্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব রকিব উদ্দিন আহমেদ আদালতের নজরে আনলে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে ওই আদেশ দেন।
বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ এই আদেশ দেন।
আদেশে বেতার ও দূরদর্শনে বিকৃত উচ্চারণ, ভাষা ব্যঙ্গ ও দূষণ করে অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, সঠিক শব্দচয়ন, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা উচ্চারণ ও বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে পদক্ষেপ নিতে বাংলা একাডেমির সভাপতিকে কমিটি গঠন করতে বলা হয়।
রুলে বাংলা ভাষার দুষণ ও বিকৃতি রোধে কেন পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত। একই সঙ্গে রেডিও ও টিভিগুলো ভাষার দূষণ ও বিকৃত করলে তাদের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়। বিটিআরসির চেয়ারম্যান, সংস্কৃতি সচিব, তথ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এরপর এ বিষয়ে আর কোনো আদেশ হয়নি।
একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তি তার ভাষা। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি ভাষা শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতারও স্মারক। সরকারি উদাসীনতা আর বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে বাংলার এই বিকৃতি রোধ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি বিকৃত অপভাষার উত্তরাধিকারী হবে।
তাই কেবল আইনি আদেশ নয়, বরং রাষ্ট্রের কঠোর তদারকি এবং জনগণের সচেতনতাই পারে সর্বস্তরে বাংলার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। আদালতের সেই ঐতিহাসিক নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়নই হোক এবারের ভাষা দিবসের অঙ্গীকার।
নবোদয়/ জেডআরসি/ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬